ইজারা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি বেবিচক ও মন্ত্রণালয়

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইজারা নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দেশের সবকটি বিমানবন্দরে লিজের মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাড়া দিয়ে লাভবানও হচ্ছে সংস্থাটি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বর্তমানে এই ইজারা নীতিমালা পরিবর্তন করতে তোড়জোড় শুরু করা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেবিচকের মধ্যে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি চিঠি চালাচালির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকটা মুখোমুখি এখন বেবিচক ও মন্ত্রণালয়। বেবিচকের অভিযোগ পুরো ইজারা নিয়ন্ত্রণে নিতে মন্ত্রণালয় সব চেষ্টা চালাচ্ছে। ইজারা বেবিচকের হাতছাড়া হলে লাভবান হবেন রাজনৈতিক নেতারা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, স্বচ্ছতার জন্যই ইজারার নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে সর্বশেষ গত মাসের প্রথম সপ্তাহে মন্ত্রণালয় থেকে বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জনসাধারণের মতামত চেয়ে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও একটি খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, বেবিচকের আওতাধীন স্থাবর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘বেবিচকের আওতাধীন স্থাবর সম্পত্তি ইজারা বিধিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক একটি খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করে মতামত দিতে হবে। তিন দিনের মধ্যে এই মতামত দিতে হবে।

এই চিঠি পাওয়ার পর বেবিচকের ঊর্ধ্বতনরা জরুরি বৈঠক করে চিঠির জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরই জেরে গত ২১ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দেন বেবিচকের চেয়ারম্যান। চিঠিতে তিনি বলেন, এমন জটিল ও সংবেদনশীল একটি বিধিমালার বিষয়ে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে মতামত চাওয়া অবাস্তব ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইজারার সবকিছু যদি মন্ত্রণালয় নিয়ে নেয় তাহলে আমাদের দরকার কী? এতে সবার মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইজারার অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষেই খরচ হয়। কেন মন্ত্রণালয় নিতে চাচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। তবে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে গেলে রাজনৈতিক নেতারাই সুবিধা পাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আসল ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি আমরা সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করেছি। তিনি আরও বলেন, ইজারার বিষয়টি বেবিচক ভালোভাবে নেয়নি। এ কারণে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

বেবিচক সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. শাকিলা পারভিন স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি দিয়ে বলা হয়েছিল নতুনভাবে ইজার দেওয়া যাবে না। সরকার আটটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আওতাধীন স্থাপনা ও সম্পদ ইজারা দেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী মহলের অনেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে এমন স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ইতিমধ্যে ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠরা রয়েছেন। বেবিচক কর্মকর্তাদের কয়েকজনের দাবি, সারা দেশে বিমানবন্দর ও অন্য সম্পদের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আধুনিকতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে ইজারা নীতিমালা ২০১৯ গ্রহণ করা হয়। ই-টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হওয়া এ প্রক্রিয়ায় বহু প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। বিপুল আর্থিক প্রস্তাবনা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ইজারা পায়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে শেষ হওয়ার পর এভাবে স্থগিতাদেশ দেওয়া বেবিচকের স্বায়ত্তশাসনের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে তারা মনে করছেন।

বেবিচক সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত বিধিমালাটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্তৃত, যা বিমানবন্দর পরিচালনা, এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড কার্যক্রম, যাত্রীসেবা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রচলিত প্রশাসনিক অনুশীলন অনুযায়ী এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কারিগরি শাখা, ইউনিট ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন, যা তিন কার্যদিবসের মধ্যে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) সঙ্গে বাংলাদেশের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিকাগো কনভেনশন-১৯৪৪-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইকাও নির্ধারিত নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা-তদারকি কাঠামো অনুসরণে বাধ্য। আইকাওর ইউনিভার্সাল সেফটি ওভারসাইট অডিট প্রোগ্রাম এবং ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক বিমান চলাচল নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। ২০১০-১১ সালের আগে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক ইজারা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অপারেশনালভাবে অকার্যকর। ওই সময় একাধিক প্রশাসনিক সংকট ও অডিট আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে যাত্রীসেবা সহজকরণ ও বিমানবন্দর পরিচালনা গতিশীল করতে ইজারা নীতিমালার সংস্কার করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালার কিছু ধারা সেই পুরনো জটিল ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব বিমান চলাচল ব্যবস্থার পরিপন্থী।

বর্তমান ইজারা নীতিমালা (২০১৯) অনুযায়ী, বেবিচক শুধু সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেবে। কোনো মালিকানা হস্তান্তর করবে না। বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকা, রানওয়ে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশের জমি, মাস্টার প্ল্যানের আওতাভুক্ত জায়গা ইজারা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় যেসব জায়গা সংবেদনশীল বলে বিবেচিত, সেসব এলাকা ইজারার জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা আছে। ইজারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয়, যা পরে নবায়নযোগ্য। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ইজারার মেয়াদ ও শর্ত আলাদা হবে। যেমন এয়ারলাইনস ও হেলিকপ্টার সার্ভিস, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য হ্যাঙ্গার বা ভবনের স্থান ইজারা দেওয়া যাবে। একই মেয়াদে ইজারা নবায়নযোগ্য। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও যাত্রীসেবার প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যাংক, এটিএম বুথ, মানি এক্সচেঞ্জ, লাগেজ সার্ভিস ও কুরিয়ার সার্ভিসের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ ইজারামূল্য প্রযোজ্য হবে। রেস্টুরেন্ট, দোকান, ফুডকোর্ট ও ডিউটি-ফ্রি বিপণির জন্য প্রাথমিকভাবে তিন বছরের ইজারা দেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ইজারা নবায়নের সুযোগ আছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বেবিচক ৩০ দিনের এমনকি ২৪ ঘণ্টার নোটিসে যেকোনো ইজারা বাতিল করতে পারে।

বেবিচক মনে করছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাশালী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের কেউ কেউ এবং এর আগে ইজারা পেতে ব্যর্থ হওয়া অনেকে বিমানবন্দরে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ইজারা নিতে আগ্রহী হওয়ায় তাদের চাপে নীতিমালা বদলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বর্তমান ইজারা নীতিমালায় কিছু ত্রুটি আছে। যার সুযোগ নিয়ে কম পরিচিত কিছু প্রতিষ্ঠান অতি উচ্চ আর্থিক প্রস্তাবনা দিয়ে বরাদ্দ হাতিয়ে নিয়েছে, যা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধীও হতে পারে। এসব কারণে বৃহত্তর স্বার্থে ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। যদি নীতিমালায় ত্রুটি থাকে তাহলে ইজারা প্রক্রিয়া শুরুর আগে কেন তা সংশোধন করা হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত