গাইবান্ধা-৩ আসন

বাইসাইকেলে করে হ্যান্ডমাইকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজার প্রচারণা

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাত উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধার পাঁচটি সংসদীয় আসন। এরমধ্যে পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর দুই উপজেলা নিয়ে গাইবান্ধা-৩ আসন। এবার এই আসনে মোট ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ভিন্নধর্মী প্রচারণায় ভোটারদের দৃষ্টি কেড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজার রহমান।

এই আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ অন্য প্রার্থীরা দলবল নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করছেন। মঞ্চ সাজিয়ে শত-শত কর্মী-সমর্থক নিয়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ করছেন। কিন্তু এখানকার স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজার রহমানের প্রচারণার কৌশলটা ভিন্নধর্মী।

সরেজমিনে শুক্রবার বেলা ২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আজিজার রহমান পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের ঘোড়াবান্ধা চৌরাস্তা বাজার, পবনাপুর, ফকিরহাট, আমলাগাছি, সমিতির বাজার, গোডাউন বাজার, আমতলী, পরে সাদুল্লাপুর উপজেলার ঝাউলার বাজার, বৈরাগীর বাজার, বদলাগাড়ী মোড়, ইদ্রাকপুর বাজার ও শেরপুরসহ পলাশবাড়ী উপজেরার মাঠেরহাট, ঢোলভাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালান।

তার সঙ্গে ঘুরে দেখা গেছে, আজিজার রহমানের নিজের পুরোনো একটি বাইসাইকেল। তাতে কাঠের ঢেঁকি বাঁধা। বাইসাইকেলের সামনে মাইক বাঁধানো। সকাল থেকে রাত অবধি বাইসাইকেলে করেই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাতে হ্যান্ডমাইকে ভোট চাইছেন। গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছেন। রাস্তায় বাইসাইকেল চলমান অবস্থায় তিনি এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে রাখছেন আরেক হাত দিয়ে হ্যান্ড মাইকে কথা বলছেন। তাকে মাইকে বলতে শোনা যায়, ও চাচি, ও খালা, ও আপা, ও দাদি, ও আন্টি, ও চাচা, ও অটোচালক ভাই, কৃষক ভাই, ও ভাতিজা আমার ঢেঁকি মার্কায় একটি করে ভোট দেন। নির্বাচিত হলে আমি বেকার সমস্যা সমাধান করবো। সংসদে গিয়ে আপনাদের সমস্যার কথা বলব। আমি আপনাদের আজিজার বিএসসি।

এ ছাড়া আজিজার রহমান কখনও রাস্তার মোড়ে-মোড়ে কখনো হাট-বাজারে বক্তব্য দিচ্ছেন। তাকে দেখতে পেয়ে লোকজন জমায়েত হচ্ছে। আজিজার রহমান পরিবর্তনের জন্য নিজের ঢেঁকি প্রতীকে ভোট চাইছেন। দোয়া করতে বলছেন। বক্তব্য শেষে নারী ও বৃদ্ধ ভোটাররা তার মাথা বুলিয়ে দিয়ে দোয়া করছেন। ছালাম দিয়ে অনেক ভোটারের সাথে কোলাকুলি করছেন।

এসব জায়গায় লোক জমায়েত করে তিনি বলছেন, সবাই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছেন। কিন্তু আমার বাইসাইকেলে পেট্রোল খরচ হয় না। তাই আমি একাই বাইসাইকেলে নিজের প্রচারণা চালাচ্ছি। আমার কোনও কর্মী বাহিনী নেই। আপনারাই আমার কর্মী। যারা আমাকে ভালোবাসে তারাই আমাকে ভোট দেবেন। আমার নির্বাচনী খরচ নেই। তাই নির্বাচিত হলে টাকা তোলারও চাপ থাকবে না। অন্যরা যারা টাকা দিয়ে ভোট কিনছে তারা নির্বাচিত হলে তো অনিয়ম-দুর্নীতি করে নিজের টাকা আগে তুলবে। আমার ক্ষেত্রে তা হবে না। বিদেশেও যাব না। আমি এখানকার সরল মানুষ, আমি এখানেই থাকব।

আজিজার রহমান বলেন, আমি পরিবারের কাছে মাত্র ১০ হাজার টাকা নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ভোটারদের কাছেও সাড়া পাচ্ছি, ভোটাররা পরিবর্তন চাইছেন। তারা ঢেঁকি প্রতীকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য আসনের তুলনায় রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, উন্নয়নের দিক দিয়ে পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুর উপজেলা অনেকটা পিছিয়ে আছে। আমি নির্বাচিত হলে জনগণের মৌলিক চাহিদা চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেষ্টা করব। নির্বাচিত হলে আমার সাথে দেখা করতে কাউকে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে না। সরাসরি আমার কাছে আসতে পারবেন। লুঙ্গি, প্যাণ্ট পড়ে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। অথচ নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রতিনিধি জনগণের সাথে প্রতারণা করেন, তাদের কথা শোনেন না, সমস্যার সমাধান করেন না, কর্মী-বাহিনী নানানভাবে হয়রানি করেন। অথচ ভোটের মালিক জনগণ। আমি নির্বাচিত হলে আমার ক্ষেত্রে তা হবে না।

তিনি শুধু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করছেন না। এর আগে তিনি কয়েকটি নিবাচর্ন করেছেন। আজিজার রহমান ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর ২০১৯ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এরপর তিনি ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢেঁকি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা থেকে জানা গেছে, আজিজার রহমানের বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের খোদা বকস গ্রামে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় তিনি তার বয়স ৫৭ বছর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি পাস উল্লেখ করেন। পেশা তিনি একজন শিক্ষক।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে আজিজার রহমান সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৮৭ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ১৯৯০ সালে পলাশবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি (স্নাতক) পাস করেন। তিনি ১৯৯১ সালে সাদুল্লাপুরের দড়ি জামালপুর রোকেয়া সামাদ দ্বিমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সেখানেই কর্মরত। তার স্ত্রী সালমা বেগম গৃহিনী। তার এক ছেলে- এক মেয়ে। ছেলে আশিকুর রহমান বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে আর মেয়ে আশা মনি রংপুরের পীরগঞ্জ আবদুর রউফ সরকারি কলেজে পড়ছেন। সম্পদ বলতে বসতভিটাসহ ৩ বিঘা জমির মালিক তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত