সিপিডির গবেষণা

গণভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট। এই ভোটগ্রহণে থাকবে আলাদা ব্যালট পেপার। তবে এই গণভোটের বিদ্যমান কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের দুর্বলতার কারণে এর ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। ভোটারদের জন্য নির্ধারিত ব্যালটে গণভোটের জন্য খুব অল্প করে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। এই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি না, সেই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন তারা।

সিপিডি মনে করে, গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে নির্বাচনী এলাকায় ‘সবুজ সমাজের পরিস্থিতি ও প্রত্যাশা : প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এমন মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ব্রিফিংয়ে তিনি জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন। এ সময় সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সিপিডির এ গবেষণায় সারা দেশের পরিবেশ ও দুর্যোগপ্রবণ ১৫০টি নির্বাচনী এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ৪৫০ জন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী এবং ১ হাজার ২০০ জন ভোটার অংশ নেন। জরিপের ফলাফলের মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকায় ‘সবুজ সমাজ’ গঠনের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভোটারদের প্রত্যাশার চিত্র তুলে ধরা হয়।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গণভোটের কাঠামো ও অধ্যাদেশে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কারণে এর ফলাফল নিয়েও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন থাকতে পারে। এ বাস্তবতায় সিপিডির পক্ষ থেকে মনে করা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে তিনি বলেন, সিপিডিসহ অন্য থিংক ট্যাংকগুলো নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণত ইশতেহার নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করে থাকে। কী ধরনের ইশতেহার হওয়া উচিত, দলগুলোর ইশতেহারের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে এবং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত এসব দিক তুলে ধরে।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং ইশতেহার ঘোষণা করে ভোটারদের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে একটি কথা বলা জরুরি, জাতীয় নির্বাচন যেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে সেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যাচ্ছে না।

সিপিডি মনে করে, দেশের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ বা ৭৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন, রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ উন্নয়ন সম্পর্কে ভোটারদের ধারণা এখনো অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক এবং জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাদের প্রভাবিত করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটার উন্নয়নের সঙ্গে ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণের বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি), উপকূলীয় অঞ্চল, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই ধারণা অত্যন্ত প্রবল।

শুধু ভোটার নয়, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও উন্নয়ন নিয়ে প্রায় একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে উন্নয়ন ধারণা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হলেও ভোটারদের ধারণা এখনো মূলত অবকাঠামোকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, ‘বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব ৯৫ শতাংশ ভোটার এমন আশাবাদী ধারণা পোষণ করেন।’ তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ধারণার এই একমুখী প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে ফেলে দিতে পারে। তাদের মতে, উন্নয়ন আলোচনায় কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমানের বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সিপিডির জরিপে পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে প্রায় ৬১ শতাংশ ভোটার ও প্রার্থীরা গাছ লাগানো এবং প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ¦ালানি সম্পর্কে জানেন, এমন ভোটারের হার ৪৭ শতাংশ এবং প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ। তবে নবায়নযোগ্য জ¦ালানিকে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

সংস্থাটির মতে, সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে ভোটারদের অগ্রাধিকার মূলত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা এই দুটি মৌলিক বিষয়ে। সিপিডির মতে, এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট যে, দেশের বড় একটি অংশ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াই করছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত