রাজধানীর বিভিন্ন আসনে গতকাল রবিবার নির্বাচনী জনসভা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জনসভায় তিনি ঢাকাসহ সারা দেশকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম কাজ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকবে জিরো টলারেন্স নীতি। চাকরির জন্য বিদেশে যেতে চাইলে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া ঢাকায় অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ তৈরি করা হবে।
প্রথমে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনে জনসভা করেন তারেক রহমান। এরপর ঢাকা-১৬ আসনে পল্লবী ২ নম্বর ওয়ার্ডের লাল মাঠে, ঢাকা-১৫ আসনে মিরপুর-১০ গোলচত্বরসংলগ্ন সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, ঢাকা-১৪ আসনে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয় গেটে, ঢাকা-১৩ আসনে শ্যামলী সিনেমা হলের পশ্চিম পাশে শ্যামলী ক্লাব মাঠে এবং সর্বশেষ ঢাকা-১১ আসনে বাড্ডা সাঁতারকূলের সানভ্যালি মাঠে জনসভা করেন তিনি।
ইসিবি চত্বরে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ঢাকায় অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ এবং রাস্তা প্রশস্ত করা হবে। ঢাকাসহ সারা দেশকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করা হবে।’ নিজেকে এলাকার সন্তান উল্লেখ করে ঢাকা-১৭ আসনে তাকে জয়যুক্ত করতে এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বলেন, ‘এই এলাকায় আমার জন্ম। এখানেই আমার বেড়ে ওঠা। এখানে আমার সন্তানের জন্ম হয়েছে, বেড়ে উঠেছে। এলাকার সন্তান হিসেবে আজ আমি ধানের শীষের জন্য ভোট চাচ্ছি। আপনারা ধানের শীষকে ভোট দিলে বিএনপি জয়ী হলে ঢাকা শহরসহ সমগ্র দেশকে নিরাপদ করতে চাই। যাতে নিরাপদে মানুষ চলাচল করতে পারে, ঢাকায় যাতে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পাবে, সেই ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ করব। এ ছাড়া ইসিবি চত্বর থেকে জসিমউদদীন পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করা হবে।’
সাধ্য ও ক্ষমতার বাইরে প্রতিশ্রুতি দেব না : মিরপুর-১০ নম্বর সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান বলেন, আমরা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যা মানুষের সাধ্যের বাইরে। বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। ঢাকা-১৫ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সমর্থনে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। আসনটিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এরপর পল্লবীতে ঢাকা-১৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হকের সমর্থনে জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
সেনপাড়ায় তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়, বরং দেশ পুনর্গঠন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। নির্বাচনী ইশতেহারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেছি আমরা এই দেশের নারী বা মা-বোনদের জন্য কী করতে চাই, ছাত্র সমাজের জন্য কী করতে চাই; লাখো কোটি বেকার মানুষের কর্মসংস্থান কীভাবে করব এবং কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেব।
নারী ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যতবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি চেষ্টা করেছেন দেশের নারীদের শিক্ষাব্যবস্থা ফ্রি করে দিতে। যার ফলে আজ বাংলাদেশের মেয়েরা ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। এ জন্য প্রতিটি ঘরে গৃহিণীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় অন্তত একটি করে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে, যেখানে ভাষা শিক্ষা ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণরা নিজেরা ব্যবসা করতে পারবে অথবা বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যারা চাকরি নিয়ে বিদেশে যাবে, তাদের যেন জমি বিক্রি করতে না হয়। এজন্য স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষকদের বিষয়ে বলেন, কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশও ভালো থাকবে। এ জন্য কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, ‘গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হেলথ কেয়ার কর্মী নিয়োগ করা হবে। ঢাকা-১৫ এলাকার মানুষের চিকিৎসা-সুবিধার জন্য এখানে হাসপাতাল স্থাপন করা হবে এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ১০০ ফিট রাস্তার কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।’
দেশ পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কথা একটাই, কাজ একটাই দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের সবার প্রথম এবং শেষ ঠিকানা এই বাংলাদেশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা জুলাই আন্দোলনে আহত হয়েছেন এবং যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’
সভায় প্রার্থী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রমুখ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স : এর আগে তারেক রহমান ঢাকা-১৬ আসনে পল্লবী দুই নম্বর ওয়ার্ডের লালমাঠে জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে দলের প্রার্থী আমিনুল হকের জন্য এলাকাবাসীর কাছে ভোট চান। সভায় ‘সবার আগে দেশ’এই নীতিতে অটল থেকে যেকোনো মূল্যে দেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। দেশ গড়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন ও জননিরাপত্তায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে জনগণের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে ঠিক করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকবে বিএনপি। এ সময় তিনি বলেন, এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যা, হাসপাতালের সমস্যা রয়েছে। পানি সমস্যা দূর করতে সমগ্র বাংলাদেশে খাল-খনন করা হবে। সরকার গঠন করতে পারলে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সবার আগে ঢাকার খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হবে।’
সরকার গঠন করতে পারলে কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে, সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘চাকরির জন্য যারা বিদেশ যেতে চাইবে তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হবে। ঢাকা-১৬ আসনের মানুষদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল করা হবে।’
জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
এদিকে ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির পক্ষে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয় গেটে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ধর্মের কথা বলে একটি গোষ্ঠী মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে। দেশের সরল মা-বোনদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তাদের বিভ্রান্ত করছে। নকল সিল তৈরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে একটি দলের লোকজন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে ৭১ ও ২৪ জুলাইয়ের শহীদদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে কাজ করবে বিএনপি।’
আজ ৮টি জনসভায় যোগ দেবেন : আজ সোমবার ঢাকার আটটি স্থানে জনসভায় যোগ দেবেন তারেক রহমান। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৭টি-সহ মোট ৮টি নির্বাচনী জনসভায় যোগদান করবেন। ঢাকা-১৭ আসনের বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ খেলার মাঠে বেলা ১১টায়, ঢাকা-১০ আসনে শেখ রবিউল আলমের নির্বাচনী এলাকায় কলাবাগান ক্রীড়া চক্র মাঠে দুপুর ১২টায়, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী এলাকায় পীর জঙ্গি মাজার রোডে দুপুর ১টায়, ঢাকা-৯ আসনে হাবিবুর রশিদ হাবিবের নির্বাচনী এলাকায় বাসাবো তরুণ সংঘ মাঠে দুপুর ২টায়, ঢাকা-৫ আসনে নবীউল্লাহ নবীর এলাকায় যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোডে দুপুর ৩টায়, ঢাকা-৪ আসনে তানভীর আহমেদ রবিনের নির্বাচনী এলাকায় জুরাইন-দয়াগঞ্জ রোডে বিকেল ৪টায়, ঢাকা-৬ আসনে ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী এলাকায় ধুপখোলা মাঠে বিকেল ৫টায় এবং ঢাকা-৭ আসনে হামিদুর রহমান হামিদের নির্বাচনী এলাকায় লালবাগ বালুর মাঠে সন্ধ্যা ৬টায় নির্বাচনী জনসভায় যোগদান করবেন।
