বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক গণভোট কেবল নিয়মিত নির্বাচন ছিল না বরং এটি ছিল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন রাষ্ট্রচিন্তার প্রতি জনগণের চূড়ান্ত গণসমর্থনের প্রকাশ। এই নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মানুষ একদিকে যেমন অভিজ্ঞ ও সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষেও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এই দ্বৈত সিদ্ধান্তই বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। এবারের সংসদ একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর তুলনামূলক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে জনগণ, রাজপথের প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তার সমমনা দলগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য আস্থা রেখেছে। এই জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ভোটাররা স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল, সংসদে একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত বিরোধী বলয়ের উত্থান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং আরও নয়টি দলের সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষত তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এই জোটের সংস্কারমুখী রাজনৈতিক বয়ান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ছোট দল মিলিয়ে ৮টি আসনে জয় সংসদের বহুত্ববাদী চরিত্রকে আরও দৃঢ় করেছে। এ ফলাফল স্পষ্ট করে যে, জনগণ কোনো দলকেই নিরঙ্কুশ বা প্রশ্নাতীত ক্ষমতা দেয়নি বরং জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদই তারা প্রত্যাশা করেছে।
সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ফলাফল স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আর পুরনো, কেন্দ্রায়িত ও জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, না ভোটদাতাদের একটি অংশ হয়তো দ্রুত পরিবর্তনের গতি নিয়ে শঙ্কিত, অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই আপাত নিরাপত্তা খুঁজে পায়। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই হ্যাঁ রায় নতুন সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। গণভোটে উচ্চারিত ‘সংস্কার’ শব্দটি কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এর ভেতরে নিহিত রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোতে গুণগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট দাবি। জনগণের সংস্কার প্রত্যাশার অর্থ সংসদের মেয়াদ ও কার্যকারিতাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে নির্বাহী ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না হয়ে জবাবদিহিমূলক হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর কার্যকর সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে কাগুজে স্বাধীনতার বাইরে এনে, বাস্তব অর্থে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আকাক্সক্ষাও এই ‘হ্যাঁ’ ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে জনগণের দাবি আরও স্পষ্ট বিচারক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে কার্যকর করা। পাশাপাশি প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলীয়করণ ও আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও এই সংস্কার গণরায়ের অন্যতম মৌলিক উপাদান।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নতুন ভোটারের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনের গতিপথকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। নতুন প্রজন্ম কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য ভোট দেয়নি, তারা রাষ্ট্রের চরিত্র, ক্ষমতার কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছে। সংসদে বিরোধী জোটের শক্ত অবস্থান এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে বিপুল সমর্থনের পেছনে এই তরুণ ভোটাররাই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। এই দ্বিমুখী ম্যান্ডেট নতুন সরকারের জন্য যেমন বড় রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি এটি একটি কঠিন বাস্তব পরীক্ষাও। সরকারকে দায়িত্ব নিতে হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন কেবল রাজনৈতিক সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও এই ম্যান্ডেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে ২১২ আসনের সরকারকে সংসদের ৭৭ আসনের শক্ত বিরোধী পক্ষ এবং গণভোটের সংস্কার নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। একক কর্র্তৃত্বের রাজনীতি নয়, বরং সংলাপ, সমঝোতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিই হবে আগামীর পথ। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে আসা জনমত মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর একক ও অপ্রতিহত ক্ষমতা হ্রাসের পক্ষে জোরালো রায় দিয়েছে। জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন এবং উপ-রাষ্ট্রপতি পদের পুনঃপ্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। উচ্চকক্ষ গঠনের মাধ্যমে যেমন বিশেষজ্ঞ ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রচিন্তাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে, তেমনি উপ-রাষ্ট্রপতি পদের অস্তিত্ব ক্ষমতার এককেন্দ্রিক কাঠামোতে একটি কার্যকর সাংবিধানিক ভারসাম্য তৈরি করবে। নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের এই তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে, সংস্কারের বিশাল ম্যান্ডেট কেবল তাত্ত্বিক পরিবর্তন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। জনগণ একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে বিএনপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট ও ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। এটি কোনো একক দলের বিজয় নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্র মেরামতের আকাক্সক্ষার জয়। যদি নতুন সংসদ ও সরকার গণরায়কে আন্তরিকভাবে সম্মান করে দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার কার্যক্রমে এগিয়ে যেতে পারে, তবেই ২০২৪ সালের শহীদদের আত্মত্যাগ অর্থবহ রূপ পাবে। অন্যথায়, গণরায় বাস্তবায়িত না হলে এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রজন্মের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির প্রতারণা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর
