প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংহত করতে দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে গতকাল শনিবার পৃথক টেলিফোন আলাপে ও অভিনন্দন বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা এ আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় জনগণের এই সুস্পষ্ট রায় দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, তিনি বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারেক রহমান প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণমুখী চেতনার আলোকে দেশকে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
তারেক রহমানের পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাষ্ট্রদর্শন এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, পিতা-মাতার আদর্শ ও মহান কর্ম তারেক রহমানের আগামী দিনের চলার পথকে আলোকিত করবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশে পরিবর্তনের এই সংবেদনশীল সময়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা, সহনশীলতা প্রদর্শন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ইতিবাচক অবস্থান জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ ও এনসিপি ৬ আসন পায়।
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ফলকে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ হিসেবে অভিহিত করে প্রধান উপদেষ্টা জামায়াত প্রার্থীদের সক্রিয় ও ব্যাপক অংশগ্রহণ, দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরে নির্বাচনের ফলকে শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে গ্রহণ করার জন্য দলের আমিরকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংহত করতে হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা অপরিহার্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী একটি গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল বিরোধী শক্তি হিসেবে জাতীয় সংসদ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। নীতিগত বিতর্ক, আইন প্রণয়নে পরামর্শ, জনগণের প্রত্যাশা তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। জাতীয় ঐক্য সুসংহত করতে জামায়াত আমির অতীতে যে ভূমিকা রেখেছেন ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তা অব্যাহত রাখবেন।
নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপি যে সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, এমনটি মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা।
এনসিপি আহ্বায়ককে পাঠানো বার্তায় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, মাত্র এক বছর আগে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া নবীন রাজনৈতিক দল হিসেবে ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টি জেতা এবং আরও কয়েকটি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা এক অসাধারণ অর্জন। এটি শুধু নির্বাচনী পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের আত্মপ্রত্যয়, স্বপ্ন ও গণতান্ত্রিক চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ। এ অর্জন আগামী দিনের আরও বড় দায়িত্বের পূর্বাভাস। সংগ্রামের পথ থেকে রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ এই রূপান্তর যেন আদর্শ ও মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রাখে, সেটিই সবার প্রত্যাশা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণতন্ত্র তখনই বিকশিত হয়, যখন নতুন কণ্ঠস্বর উঠে আসে, নতুন ধারণা স্থান পায় এবং প্রজন্মান্তরের সেতুবন্ধ তৈরি হয়। এই অল্প সময়ে এনসিপির সাফল্য প্রমাণ করে বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষত তরুণ সমাজ, নীতিনিষ্ঠ ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আস্থা রাখতে প্রস্তুত। এই আস্থা রক্ষা করা এখন এনসিপি নেতাদের বড় দায়িত্ব।
