ছোটবেলার একটি স্মৃতি থেকেই গাছের সঙ্গে গড়ে ওঠে আজীবনের ভালোবাসা। তখন তিনি ক্লাস সেভেনের ছাত্র। একদিন গ্রামের এক পীরের দরগাহের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কামিনি ফুলের মিষ্টি গন্ধে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। সেই গন্ধই তাকে টেনে নেয় গাছের কাছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি কামিনি গাছ সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে রোপণ করেন। সেখান থেকেই শুরু গাছ লাগানো হয়ে ওঠে তার নেশা, তার আনন্দ।
কলেজে পড়ার সময় বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাঁনপুর গ্রাম থেকে ১০০টি কাঁঠাল গাছ এনে বাড়ির চারপাশে লাগান তিনি। সাত বছরের মাথায় সেই গাছগুলোতে প্রচুর কাঁঠাল ধরতে শুরু করে। নিজে খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনদের মাঝেও বিলিয়ে দেন। এরপর একে একে জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, হিজলসহ নানা জাতের ফলদ ও বনজ গাছ লাগাতে থাকেন বিভিন্ন স্থানে।
পড়ালেখা শেষ করে তিনি কৃষি ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন। চাকরি জীবন শেষে এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। তবে অবসর নিলেও গাছ লাগানোর নেশা তাকে ছাড়েনি। এখনও মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে গাছ লাগান, লাগানো গাছের পরিচর্যা করেন।
প্রায় ৫৪ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পাঁচ হাজারের বেশি গাছ লাগিয়েছেন। এ কারণেই এলাকায় তিনি পরিচিত ‘বৃক্ষপ্রেমী’ নামে। বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটি হলেন আখাউড়া পৌরশহরের দেবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা ইকবাল আহাম্মদ খান।
কথা হয় ইকবাল আহাম্মদ খানের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৯৬৮-৬৯ সালে হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই গাছ লাগানো শুরু করেন। কলেজে কৃষি বিভাগে পড়ার সময় তৎকালীন অধ্যক্ষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. এম. মো. ইছহাক স্যারের অনুপ্রেরণায় গাছের প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। স্কুল-কলেজের মাঠের পাশে, রাস্তার ধারে, রেললাইনের পাশে—যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই গাছ লাগিয়েছেন। চাকরির সুবাদে কসবা, সরাইল ও বর্তমান বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ও মুকুন্দপুর এলাকাতেও গাছ লাগিয়েছেন।
এছাড়া আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজের সহঃ অধ্যাপক কামাল উদ্দিনের সহযোগিতায় কলেজ মাঠের পাশে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমর স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে বহু গাছ আজ দাঁড়িয়ে আছে। দেবগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশেও তার লাগানো গাছ আছে।
ইকবাল আহাম্মদ খান বলেন, গাছপালা তাপমাত্রা কমায়। জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া গাছ ২ থেকে ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা কমাতে পারে। গাছ লাগালে এলাকা সুন্দর হয়, ফুল দেখলে মানুষের মন ভালো হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, অনেক জায়গায় গিয়ে দেখি গাছ ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে আবার নতুন করে গাছ লাগাই। এলাকার মানুষকে গাছের যত্ন নিতে অনুরোধ করি। কখনও কখনও পরিচর্যার জন্য নিজের পকেট থেকে টাকাও দিই।
গাছ লাগিয়ে কেমন অনুভব করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গাছ লাগিয়ে আমি মানসিক শান্তি ও আনন্দ পাই। নিজের টাকা খরচ হলেও তৃপ্তি লাগে। সমাজের জন্য যদি কিছু করতে পারি, মানুষকে একটু সৌন্দর্য দিতে পারি এটাই আমার স্বার্থকতা। পরিবেশ দূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন,যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, পরিবেশ দূষণ বাড়ছে তাতে গাছ লাগানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। একমাত্র গাছই পারে পরিবেশকে বাঁচাতে।
সাধারণ মানুষের প্রতি তার একটাই আহ্বান ‘বছরে অন্তত একটি হলেও গাছ লাগান।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজের সহ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন ইকবাল আহাম্মদ খান একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। তিনি নিজের টাকা খরচ করে গাছ লাগান। যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
