সামরিক স্থাপনার শক্তি বাড়াচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১০ এএম

২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশ শক্তির সবচেয়ে বড় সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক দিনে বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও সহায়ক সরঞ্জাম এ অঞ্চলে পাঠিয়েছে দেশটি। একদিকে দুই দেশই কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে। তবে বসে নেই ইরানও; যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজেদের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা মেরামত এবং শক্তিশালী করছে ইরান। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ‘বন্ধ’ ঘোষণা করে লাইভ ফায়ার মহড়া চালাচ্ছে তেহরান। একই সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার ওমান সাগরে রাশিয়াকে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করছে ইরান। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্রগুলো প্রমাণ দিচ্ছে যে, ইরান সম্প্রতি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সামরিক এলাকায় নতুন একটি স্থাপনার ওপর কংক্রিটের ঢাল নির্মাণ করেছে এবং সেটিকে মাটির স্তর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের বোমা হামলার শিকার হওয়া একটি স্থানে ইরান কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। চিত্রগুলোতে আরও দেখা যায়, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র যে পারমাণবিক স্থাপনাটিতে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেখানে ইরান সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো মাটির নিচে চাপা দিয়েছে। এ ছাড়া, আরেকটি স্থাপনার কাছে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো আরও মজবুত করা হয়েছে এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোও মেরামত করা হয়েছে। তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার (২০ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পারচিন কমপ্লেক্স হলো ইরানের অন্যতম স্পর্শকাতর সামরিক এলাকা। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, দুই দশকেরও বেশি সময় আগে তেহরান এখানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো চালিয়েছিল। যদিও ইরান সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে।

জানা গেছে যে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল পারচিন কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছিল। ওই হামলার আগে এবং পরে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে পারচিনের একটি আয়তাকার ভবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায় এবং ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বরের চিত্রে সেখানে দৃশ্যত পুনর্নির্মাণের কাজ লক্ষ করা গেছে। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবরের চিত্রগুলোতে ওই এলাকায় আরও উন্নয়ন দেখা যায়। সেখানে একটি নতুন স্থাপনার কাঠামো এবং এর পাশে দুটি ছোট স্থাপনা দৃশ্যমান ছিল। ১৪ নভেম্বরের চিত্রে সেই কাজের অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে বড় কাঠামোটি একটি ধাতব ছাদ দিয়ে ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। তবে ১৩ ডিসেম্বরের চিত্রগুলোতে স্থাপনাটি আংশিকভাবে ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটি আর মোটেও দেখা যাচ্ছিল না। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কংক্রিট কাঠামোর মাধ্যমে এটি পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) গত ২২ জানুয়ারি স্যাটেলাইট চিত্রের একটি বিশ্লেষণে সাইটটিতে নতুন নির্মিত একটি স্থাপনার চারপাশে একটি ‘কংক্রিট সারকোফ্যাগাস’ (বিশাল পাথুরে কফিনসদৃশ কাঠামো) তৈরির অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে, যেটিকে তারা ‘তালেঘান ২’ হিসেবে শনাক্ত করেছে। আইএসআইএস নভেম্বরেই জানিয়েছিল, স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে চলমান নির্মাণকাজ এবং একটি দীর্ঘ নলাকার চেম্বারের মতো কাঠামো দেখা গেছে, যা সম্ভবত একটি উচ্চ-বিস্ফোরক ধারণপাত্র (হাই-এক্সপ্লোসিভ কনটেইনমেন্ট ভেসেল)। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬ মিটার এবং ব্যাস প্রায় ১২ মিটার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে, যা একটি ভবনের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে।

আইএসআইএস জানায়, উচ্চবিস্ফোরক ধারণকারী পাত্রগুলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলো অন্যান্য অনেক প্রচলিত অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়াতেও ব্যবহৃত হতে পারে। কনটেস্টেড গ্রাউন্ডের ফরেনসিক চিত্র বিশ্লেষক উইলিয়াম গুডহাইন্ড বলেন, স্থাপনাটির ছাদের রঙ চারপাশের এলাকার রঙের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি আরও বলেন, ‘কংক্রিটের রঙ আড়াল করার জন্য সম্ভবত এর ওপর মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আইএসআইএসের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অলব্রাইট এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আলোচনা দীর্ঘায়িত করার কিছু সুবিধা আছে। গত দুই থেকে তিন সপ্তাহে ইরান তাদের নতুন তালেঘান ২ স্থাপনাটি মাটির নিচে চাপা দিতে ব্যস্ত ছিল, সেখানে এখন আরও মাটি পাওয়া যাচ্ছে এবং শিগগিরই এ স্থাপনাটি একটি সম্পূর্ণ অচেনা বাঙ্কারে পরিণত হতে পারে, যা বিমান হামলা থেকে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা প্রদান করবে।

ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্স : ইসফাহান কমপ্লেক্স হলো ইরানের সেই তিনটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি, যেখানে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালিয়েছিল। পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত এমন স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি ইসফাহানে একটি ভূগর্ভস্থ এলাকা রয়েছে, যেখানে কূটনীতিকদের মতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় একটি অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। জানুয়ারির শেষের দিকে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে এ কমপ্লেক্সের দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথ মাটিচাপা দেওয়ার নতুন প্রচেষ্টা দেখা গেছে। ৯ ফেব্রুয়ারির হালনাগাদ প্রতিবেদনে আইএসআইএস জানায়, তৃতীয় একটি প্রবেশপথও মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। অর্থাৎ সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের সব প্রবেশপথই এখন ‘সম্পূর্ণভাবে মাটিচাপা’ পড়েছে। উইলিয়াম গুডহাইন্ড বলেন, ১০ ফেব্রুয়ারির স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, তিনটি সুড়ঙ্গই পুরোপুরি মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। আইএসআইএস ৯ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে জানায়, সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করলে সম্ভাব্য বিমান হামলার প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভেতরে যদি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংরক্ষিত থাকে, তবে তা দখল বা ধ্বংস করতে বিশেষ বাহিনীর স্থল অভিযানে প্রবেশাধিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।

নাতাঞ্জের প্রবেশপথ শক্তিশালী হয়েছে : নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি একটি কমপ্লেক্সে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শক্তিশালী করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে আইএসআইএস। সংস্থাটি জানায়, ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, নাতাঞ্জ থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের দুটি প্রবেশপথ ‘কঠোর ও প্রতিরক্ষামূলকভাবে আরও মজবুত’ করার কাজ চলছে। নাতাঞ্জেই ইরানের অন্য দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র অবস্থিত। স্যাটেলাইট চিত্রে এ প্রচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমপ্লেক্স জুড়ে চলমান কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। এতে ডাম্প ট্রাক, সিমেন্ট মিক্সারসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী বহু যানবাহনের চলাচল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইএসআইএস জানায়, ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত এ স্থাপনাটির জন্য ইরানের পরিকল্পনা কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

শিরাজ দক্ষিণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি : দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের মতে, মাঝারিপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম ২৫টি প্রধান ঘাঁটির একটি। আলমার মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গত বছরের যুদ্ধে ঘাঁটিটি ভূমির ওপরে হালকা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ফরেনসিক চিত্র বিশ্লেষক গুডহাইন্ড ২০২৫ সালের ৩ জুলাই এবং ৩০ জানুয়ারির স্যাটেলাইট চিত্র তুলনা করে জানান, ঘাঁটির প্রধান লজিস্টিক এলাকা এবং সম্ভাব্য কমান্ড কমপ্লেক্সে পুনর্গঠন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণের কাজ চলছে।

কুম ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি : আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের মতে, কুম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এ ঘাঁটিটি গত বছরের সংঘাতে ভূমির ওপরে মাঝারিমাত্রার ক্ষতির শিকার হয়েছিল। গুডহাইন্ড ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই থেকে ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তোলা স্যাটেলাইট চিত্র তুলনা করে দেখেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের ওপর নতুন ছাদ বসানো হয়েছে। তিনি জানান, ছাদ মেরামতের কাজ সম্ভবত ১৭ নভেম্বর শুরু হয় এবং প্রায় ১০ দিনের মধ্যেই তা শেষ হয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ক্ষতির পর ঘাঁটিতে পুনর্গঠনের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত