ভাষার জন্য এ দেশের মানুষের লড়াই অনেক আগে থেকে। সে সময়ে অনেকেই বাংলাকে বাঙালি মুসলমানের ভাষা হিসেবে মেনে নিতে চাইত না। সে সময় মাতৃভাষার পক্ষে কলম ধরেন কবিরা। এদের মধ্যে আবদুল হাকিম তার কবিতায় স্পষ্টভাবে সমালোচনা করেছেন বাংলা বিরোধিতাকারী কবিদের। তিনি কবিতায় বলেছেন, ‘দেশি ভাষা বিদ্যা যার মন ন যুয়ায়/ নিজ দেশ তেয়াগি কেন বিদেশ ন যায়। অর্থাৎ বাংলায় বসবাস করে যারা বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে পারে না তারা কেন এ দেশে বাস করছে? তারা কেন এ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে না। আরও তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয়ন জানি। অর্থাৎ বাংলায় বসবাসকারী ব্যক্তি কখনো বাংলা ভাষার বিরোধিতা করতে পারে না। যারা বিরোধিতা করছে তারা নিশ্চিতভাবেই দেহে বাঙালি রক্ত ধারণ করে না। ভাষা নিয়ে এ লড়াই দিন যত গেছে বেড়েছে। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ইংরেজরা ভারতীয় উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দিতে স্থির করল। কিন্তু অখ- ভারতের পরিবর্তে তারা দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিল। এ সিদ্ধান্ত অবশ্য সে সময়ের প্রথিতযশা ও নেতৃত্বদানকারী রাজনীতিকদের কাছ থেকেই এসেছিল। সিদ্ধান্ত হলো, যে অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি সেই অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তান এবং অন্যান্য অঞ্চল নিয়ে গঠিত হবে ভারত। পাকিস্তান সৃষ্টির গুঞ্জন শুরু হওয়ার দিন থেকেই ভাষার প্রশ্ন আবারও সামনে আসে। কারণ পাকিস্তান দুটি অংশ বিভক্ত। পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা) ও পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব বাংলায় মুসলিম প্রধান হওয়ায় তারা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে রাজি হলেও ভাষার প্রশ্নে ছাড় দিতে রাজি ছিল না। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী কারণে উর্দু হওয়া উচিত তা নিয়ে উর্দুভাষী কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা তখন থেকেই লেখালেখি করা শুরু করেছিল। তবে পিছিয়ে ছিলেন না বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরাও। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভেতরেও জনমত গঠিত হয় এবং ভাষার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি হয়। যার পথ বেয়েই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ হন এ দেশের সংখ্য মানুষ। জীবন দেন সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউর। তাদের আত্মত্যাগ দেশের মানুষকে তীব্র আন্দোলন করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের দাবিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। অবশেষে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তারা। ভাষা আন্দোলনের এই দীর্ঘ সংগ্রামের একজন অগ্রণী যোদ্ধা ছিলেন আহমদ রফিক। নিজে রাষ্ট্রভাষা বাংলা আন্দোলনের একজন সংগঠক ছিলেন বলে এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। নতুন প্রজন্মকে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে জানাতে পরবর্তী সময়ে তুলে নিয়েছেন কলম। একের পর এক রচনা করেছেন বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বই। ভাষা আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তার লিখিত বই ‘একুশের মুহূর্তগুলো’। এই বইতে তিনি তুলেছেন ভাষা নিয়ে বাঙালির বিভিন্ন সময়ের লড়াই। তিনি বইটিতে তুলে এনেছেন মাতৃভাষার পক্ষে মধ্যযুগের কবিদের লড়াই, বিশ শতকে বাংলার পক্ষে চলা বিতর্ক, বাংলা ভাষার সপক্ষে বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখি, বাংলা ভাষার জন্য গণপরিষদের রাজনীতিকদের লড়াই, জিন্নাহর ঘোষণায় ছাত্রদের প্রতিবাদ, ভাষার জন্য ছাত্র-জনতার প্রাণদান এবং শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি। তবে এর মাঝেও ঘটেছে নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনা। শেষ মুহূর্তে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া কোনো কোনো পক্ষ পিছু হটেছিল। সুলেখক ও ইতিহাসবিদ আহমদ রফিক তুলে ধরেছেন ইতিহাসের সেই ধূসর অধ্যায়গুলোও। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ‘একুশের মুহূর্তগুলো’ বইটি তোমাদের ভীষণ সাহায্য করবে।
সুলতানা রাজিয়া