প্রয়াত ‘চৌরঙ্গী’-র স্রষ্টা শংকর

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় লেখক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘শংকর’ নামেই বেশি পরিচিত, প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। ‘চৌরঙ্গী’-র মতো কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন ও তার নানা মানবিক টানাপোড়েন যিনি অমর করে গেছেন, তিনিই আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

শংকরের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৫৫ সালে ‘কত অজানারে’ উপন্যাসের মাধ্যমে। অল্প বয়সে লেখা এই বই তাঁকে পাঠকমহলে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যপথের ভিত রচনা করে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঠকহৃদয় জয় করে আসা শংকরের লেখা শুধু বাংলার সীমানা পেরিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর একাধিক উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে, যা বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সম্পদ। কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাস নিয়ে ছবি তৈরি করেন। অন্যদিকে, ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে স্যাটা বোসের চরিত্রে অভিনয় করে মহানায়ক উত্তম কুমার নিজের কেরিয়ারে এক অনন্য ছাপ রেখে যান। সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে শংকর একবার বলেছিলেন, সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।

জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘চৌরঙ্গী’ এক অনন্য মাইলফলক। ২০১২ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটির ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে একটি বিরল কৃতিত্ব। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘বোধোদয়’ প্রকাশের পর প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া’ বলে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন, ‘তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।’

১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম নেওয়া শংকর ছোটবেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরের অশান্ত সময় দেখেছেন। স্বাধীনতার বছরেই পিতৃবিয়োগের পর জীবিকার তাগিদে কখনও কেরানির কাজ, কখনও গৃহপরিচারক, এমনকি হকারির কাজও করেছেন তিনি। এই কঠিন বাস্তবের মধ্যেই রিপন কলেজে পড়ার পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’।

শুধু কল্পকাহিনি নয়, বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন নিয়ে লেখা তাঁর গবেষণাগ্রন্থগুলিও দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় ছিল। ২০১৪ সালে ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি পান সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার। যদিও সাহিত্যমহলের একাংশের মতে, তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি প্রাপ্যের তুলনায় অনেক দেরিতেই এসেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত