বিশ্ববিদ্যালয় জীবন স্বপ্ন গড়ার সময়। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধুত্ব, স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ সব মিলিয়ে এটি তারুণ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ক্যাম্পাস জুড়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত চলাফেরা, ক্লাসে দৌড়ঝাঁপ, ক্যান্টিনে আড্ডা কিংবা লাইব্রেরিতে গভীর মনোযোগের দৃশ্য দেখে মনে হয়, সবাই বুঝি নিজের লক্ষ্যের পথে নিশ্চিন্তে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নীরব বাস্তবতা মানসিক চাপ, যা ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ভেতরে শেকড় গেড়ে বসে।
সমস্যাকে চিহ্নিত করার নেই উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার চাপ স্কুল-কলেজের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করলেই চলে না; কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, রিসার্চ ও গ্রুপ ওয়ার্ক সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। প্রতিটি সেমিস্টার যেন একেকটি দৌড় প্রতিযোগিতা, যেখানে থামার সুযোগ নেই। ফলাফল ভালো না হলে যেমন হতাশা আসে, তেমনি ভালো করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কমে না। এই অনিশ্চয়তার চাপ অনেক শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে, অথচ তারা সেটিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয়। এটিকে যে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে সেটিই অজানা থেকে যায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে।
পথ আগলে দাঁড়ায় ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা
বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সামনে শুধু ডিগ্রি অর্জনই লক্ষ্য নয়; ভালো চাকরি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ইন্টার্নশিপ, সহশিক্ষা কার্যক্রম সবকিছুতেই এগিয়ে থাকার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কেউ একাধিক জায়গায় কাজ করছে, কেউ আবার নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করছে। এই প্রতিযোগিতার ভেতরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে, যা আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চাপ বাড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সোশ্যাল মিডিয়া এই মানসিক চাপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা লিংকডইনে প্রতিদিন চোখে পড়ে সাফল্যের গল্প কেউ স্কলারশিপ পেয়েছে, কেউ বিদেশে যাচ্ছে, কেউ ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছে। এসব পোস্ট অনেক সময় অনুপ্রেরণা দেওয়ার বদলে তুলনার জন্ম দেয়। নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের অর্জন মিলিয়ে দেখতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ভাবতে শুরু করে, ‘আমি কি পিছিয়ে পড়ছি?’ এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে মানসিক অস্থিরতার রূপ নেয়।
চেপে বসে না বলা কথার পাহাড়
হল বা মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বেশি। পরিবার থেকে দূরে থাকার ফলে আবেগগত সমর্থনের অভাব তৈরি হয়। পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হলে বেশিরভাগ সময়ই বলা হয় ‘সব ঠিক আছে’, কিন্তু এই কথার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে না বলা কষ্ট, ভয় আর অনিশ্চয়তা।
নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মানসিক চাপের ধরন বহুমাত্রিক। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে তাদের মানসিক চাপ বহুগুণ হয়ে ওঠে। আবার পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ‘সব সময় শক্ত থাকতে হবে’ এই সামাজিক ধারণা মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সংস্কৃতির অভাব। আমাদের সমাজে এখনো মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা হতাশাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। অনেকে মনে করেন, এসব নিয়ে কথা বললে তাকে দুর্বল ভাবা হবে বা গুরুত্ব দেওয়া হবে না। এই ভয় থেকেই তারা নিজের ভেতরে চাপ জমিয়ে রাখে, যা একসময় বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
পর্যাপ্ত নয় কাউন্সেলিং সেবা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা থাকলেও তা অনেক সময় পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থীদের কাছে সহজভাবে পৌঁছাইও না। অনেকে জানেও না কোথায় যেতে হবে, কেউ আবার সংকোচের কারণে যেতে চায় না। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো মানসিক সহায়তা পেলে অনেক সমস্যা সহজেই সমাধানযোগ্য।
যা করতে হবে সমস্যা চিহ্নিত করুন
যে কোনো সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করতে পারলে সমাধান অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই আগে বুঝতে হবে পড়াশোনার সমস্যার পেছনে স্কিলের ঘাটতি, চেষ্টার অভাব, ভুল বন্ধুদের সার্কেল, নাকি বাস্তবতা থেকে দূরে থেকে কল্পনার জগতে বেশি থাকা কাজ করছে কিনা। নিজের উন্নতির জায়গাগুলোতে সবসময় ফোকাস রাখতে হবে, অন্যদের দোষ দেওয়ার পরিবর্তে।
অনুভূতি ভাগ করে নিন
মানসিক সুস্থতার জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অনুভূতির কথা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, অতিরিক্ত চাপের সময় বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। পাশাপাশি সহপাঠীদের মধ্যে সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে উঠলে তারা একে অপরের জন্য শক্তির জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
চাই সম্মিলিত উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগঠন সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই নীরব সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
নিতে হবে নিজের যত্ন
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট মোকাবিলায় নিজেকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত রাখার পরামর্শ জানালেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সাইকোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের পরিচালক মিরাজ হোসেন। মানুষ হিসেবে অপূর্ণতা সহজাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টায় যেন কোনো কমতি না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে নিয়মিত নতুন সমস্যার মোকাবিলা করলে ধীরে ধীরে আমাদের রেজিলিয়েন্স ও টলারেন্স লেভেল বৃদ্ধি পায়।’ এক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমস্যাকে সমস্যা না ভেবে সুযোগ হিসেবে দেখা জীবনকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে এবং একাডেমিক সফলতাও এনে দেয়।’ মানসিক সংকট প্রকট হয়ে উঠলে নিতে দ্বিধা না করে পেশাদার সাহায্য নিতে উৎসাহ দিয়ে এই মনোবিদ বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিন্তা ও সুস্থ লাইফস্টাইল অনুসরণ করার মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের এই মানসিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ (পঞ্চম সেমিস্টার) কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
