কেবল নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ নয়, আনুষঙ্গিক আরও অনেক কাজের রেকর্ড বই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল দ্রুততম সময়ে চালু, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোসহ বিস্তর কাজ তার। আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণও বাদ নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিয়মিত ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলাচলের চেষ্টাও করছেন। যথাসময়ে অফিসে পৌঁছে সবাইকে অবাক করে দিচ্ছেন। রাত পর্যন্ত অফিস করছেন। ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পাশাপাশি অনির্ধারিত মিটিংও করছেন। খোঁজ নিচ্ছেন মায়ের পুরনো স্টাফদের। মাঝেমধ্যে ভিভিআইপি প্রটোকলের বাইরে চলে আসছেন। পথে বিভিন্ন ট্রাফিক পয়েন্টে যানজটে আটকে থাকার সময়, পথচারীরা প্রধানমন্ত্রীকে দেখে এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে করছেন শুভেচ্ছা বিনিময়। প্রথম দিন থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। দ্রুত সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দৃষ্টে শিগগিরই সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে চান। তার পারিষদকে কাজের নমুনা দেখতে ১৮০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে কর্মসূচির আওতায় বেশিরভাগ খাল খনন করা হবে। পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলায় এই কার্ড চালুর ব্যবস্থা করা হবে। বিএনপির প্রতিশ্রুতির মধ্যে, ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য-কটাক্ষ করেছে সবচেয়ে বেশি। সেসব বিবেচনায় না নিয়ে তারা সরকার গঠন করেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করছে। অর্থনীতিকদের কারও কারও পরামর্শ ছিল, বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কিছুদিন, অন্তত চলতি অর্থবছরটি অপেক্ষা করার। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেরি করা যায়নি।
প্রতিবছর ৫ কোটি করে বৃক্ষরোপণের সিদ্ধান্তও হয়েছে। কাজের এ গতিধারার মধ্যে বাধাও কম আসছে না। জনাকয়েক মন্ত্রী উল্টাপাল্টা কথায় ভাইরালের হিরোইজমে ভুগছেন। ওবায়দুল কাদের, হাছান মাহমুদের রিপ্লেস তাদের মধ্যে। কঠোর হয়ে তাদের এবং দলের আরও কয়েকজনকে নিয়ন্ত্রণ না করলে ঝুঁকির লক্ষণ আছে। তাদের লাগাম টানা না গেলে, নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হবে। কখন কোন বিতর্কটা ফাল হবে কেউ বলতে পারেন না। এছাড়া বিএনপির বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অনেকের বিরুদ্ধে এখনো চাঁদাবাজি-দখলবাজির বেশুমার অভিযোগ। তার ওপর রাজনীতিতে নতুন নতুন উপাদান-উপসর্গ তৈরি হয়ে চলছে। বয়ানও অনেক। তবে বন্দোবস্ত আগেরই। ’৯০ এর এরশাদের পতনের পর আবার জুলাই অভ্যুত্থানের পরও আশা জেগেছিল, এবার বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিপরীতে নতুন রাজনীতির বিকাশ হবে। কিন্তু নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে, এবারও সেটা হচ্ছে না। ছোট দলগুলো যারা একব্যক্তি নির্ভর, তারা সংসদে আসনের জন্য বড় দলে চলে গেলেন বা যেতে বাধ্য হলেন। আবার এনসিপিও আসনের জন্য জামায়াতের সঙ্গে গেল। পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের ভ্যালুও বাড়বাড়ন্ত। তাদের কাছে ভোট ভিক্ষা করতে হয়েছে, বিএনপি-জামায়াত দুই জোটকেই।
জুলাই আওয়ামী লীগের কাঁধে অনেক বোঝা চাপিয়েছে। এখন তারা হয়তো আবার ফিরছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ অফিস খুলছে। কথা ও বয়ানে নতুনত্ব থাকলেও, সব মিলিয়ে পুরনো তরিকাই বহাল। আন্দোলন বা নির্বাচনী মৌসুমে কত জনে কত কথাই বলেন। পরে তা হারিয়ে যায়। মানুষও ভুলে যায়। কথায় বলা হয় রাজনীতিবিদরা সত্য বললে, রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থাদি কোরআন, গীতা বা বাইবেল স্পর্শ করে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ উচ্চারণ করেও যে সমাজে অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, প্রকৃত দোষী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়, সে সমাজে রাজনীতির কাছ থেকে বাড়তি সত্যালাপ-সদাচার নিরর্থক। দেশে যারা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন, তাদের শপথ উচ্চারণে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করা হয় না। তাদের শপথ পাঠ করতে হয় সুন্দর কয়েক বাক্যে দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। শপথ গ্রহণকারী কেউ কেউ তাদের শপথকে কেবল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করেন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর তারা যে ধরনের কার্যকলাপে নিয়োজিত হন, অনেক ক্ষেত্রে তার সঙ্গে শপথের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। নানা ঘটনা প্রবাহে মানুষও তা মনে রাখে না। তারপরও তো কথা আছে। সময় ও ঘটনা ভুলে যাওয়া, কখনো কখনো আত্মহননও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সাফল্যে সাড়ে ১৫ বছর জাতির কাঁধে চেপে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন না হলে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো ২০২৯ সালে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সফলতাই সেই নির্বাচনকে তিন বছর এগিয়ে আনতে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। নির্বাচনী ফলাফলের পর রোজা মুখে ক্ষমতায় অভিষেক এ সরকারের। রহমত-বরকত-নাজাতময় রমজানে বাজারের আগুনকে সাথী করতে হয়েছে। ‘আর ক’টা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি’ টাইপের কিচ্ছা শোনানোর অপশন নেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ সব শেষ করে গেছে, তার ওপর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অনেক তালগোল পাকিয়ে গেছে কোনো ছুতায় নিস্তার মিলবে না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সবদিক সামলাতে হবে। ফয়সালা আনতে হবে নগদে, দেখাতে হবে টাটকা ফলাফল। এটাই কঠিন বাস্তবতা। সেই কঠিনকে জয় করার ওয়াদা তিনি করেছেন ক্ষমতায় আসার বছর কয়েক আগেই। তার ওপর নির্বাচনী ইশতেহার, এর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় নতুন আরও অনেক ওয়াদা। গেল ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছর পর দেশে ফিরে এসে তারেক রহমান জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে আমেরিকার নাগরিক আন্দোলনের মহান নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের অনুকরণে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। নির্বাচনের আগে চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশগুলোতে তার সেই প্ল্যান জনগণের সামনে তুলে ধরেন। দারিদ্র্য বিমোচন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করা, শিক্ষার যুগোপযোগী আধুনিকায়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, কৃষিবান্ধব নীতি ইত্যাদি ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা পেশ করেন। এখন এসব অঙ্গীকার পূরণের পালা। কিন্তু পথ সোজা নয়। ভেজাল অনেক। সংসদে শপথ নেওয়ার দিনই তা পরিষ্কার। এবারের নির্বাচনে দুই ভোট হয়েছে। একটি প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর গণভোট। অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিশাল জয় পেয়েছে বিএনপি। আবার ওদিকে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে প্রায় একই রকম দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাধিক্যে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, অঙ্ক তো ঠিকই আছে। নিশ্চয়ই জয়ীরা ‘হ্যাঁ’ এবং পরাজিতরা ‘না’ ভোট দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি অত সরল নয়। গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে সিল দিয়েছেন ৩১ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি ভোটদাতা।
জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, তার অনেকগুলোই গণভোটে ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে অনুমোদিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন। এখানে ‘স্বাক্ষরিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। দাবি করা যাবে, জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যেসব ইস্যুতে দেওয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে বিএনপি আইনগতভাবে বাধ্য নয়। যেহেতু বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছে, কাজেই সংসদে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী সংবিধান সংশোধনের অধিকার কোনো গণভোট দ্বারা চালিত হতে পারে না বলেও দাবি করা যায়। কথার পিঠে কথা অনেক আছে। ভোটারদের ৫০ শতাংশ বিএনপি জোটের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই ভোটারদের চেয়ে অনেক বেশি ৬৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল দিয়েছে। এখন আইন ও সংবিধানের ব্যাখ্যায় ভোটারদের ৫০ ভাগ জিতবে নাকি ৬৯ ভাগ জিতবে, সেটাও বিষয়। মোটকথা গোলমাল রয়েই গেল। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি, নতুন অভিজ্ঞতা। দু’পক্ষের বয়ান বড় কড়া। সাধারণ মানুষ এমন একটি অবস্থা ও জেদাজেদির পরিস্থিতি ভাবেননি। তারা চান স্থিতিশীলতা। স্বভাবগতভাবে এ দেশের মানুষ অল্পতে তুষ্ট। কখনো কখনো কিছু না পেলেও মেনে নেয়। পাওয়ার লক্ষণ দেখলে খুশিতে বগল বাজায়। তা তারা ড. ইউনূসকে পেয়েও বাজিয়েছে। প্রাপ্তির নানা গরমিলের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণে নতুন অধ্যায়ের পর তাদের আরেক স্বস্তি। এবারের নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। প্রত্যাশার পারদ বেশ তুঙ্গে। রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে দৃশ্যমান পরিবর্তন, নীতির অগ্রাধিকারে স্পষ্টতা এবং শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব এ খাতকে দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের ধারাবাহিকতায় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোর বদলে বরং পরিস্থিতিকে আরও নাজুক ও ভঙ্গুর করেছে সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংকিং খাতে ভগ্নদশা। ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতায় বিনিয়োগে মন্দা। বড় রাজস্ব ঘাটতি। এসব ভঙ্গুর, রুগ্ণ আর বিপর্যস্ত-বিশৃঙ্খল অর্থনীতি ও দায়দেনার বোঝা পড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে। এখান থেকে ঘাড় সরানোর কোনো জো নেই।
লেখকঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন