কক্সবাজার শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনহীন একটি এলপিজি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চালু হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এ ঘটনায় অন্তত ১২ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া আগুনে প্রায় দুডজন ট্যুরিস্ট জিপ ও তিনটি বসতঘর পুড়ে গেছে। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পর এলাকায় এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আগুন লাগার পর পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মহাসড়কে দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ১০টি ইউনিটের যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই জনবসতির মধ্যে অনিরাপদভাবে এই গ্যাস পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এ জন্য কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এবং কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান। ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো দগ্ধদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন চকরিয়া উপজেলার সিকদারপাড়া এলাকার মিজানুর রহমানের ছেলে সাকিব (২৪), রামুর জোয়ারিয়ানালা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে মো. সিরাজ (২৪), কলাতলী এলাকার মৃত মো. জাকারিয়ার ছেলে আব্দুর রহিম (৪৫) এবং আদর্শ গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে মোতাহের (৪৫)। বাকিদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, কলাতলীর দক্ষিণ আদর্শ গ্রামের জনবসতিতে বাইপাস সড়কের লাগোয়া এন আলম গ্রুপ অব কোম্পানির এই এলপিজি গ্যাস পাম্প স্থাপন করা হয়। মাত্র তিন দিন আগে পাম্পটি গ্যাস বিক্রি শুরু করে। দুই দিন না যেতেই ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হয়। বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে প্রথম আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও গ্যাস লিক বন্ধ করা যায়নি। পাম্পের ১০০ মিটারের মধ্যে আগুন জ্বালানো নিষেধ করে মাইকিং করা হয়। কিন্তু পূর্ব পাশের একটি গাড়ি মেরামত গ্যারেজে কেউ অসাবধানতাবশত সিগারেট ধরালে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে।
ক্ষতিগ্রস্ত ট্যুরিস্ট জিপের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে আড়াই মাস আগে তৈরি করা আমার জিপটি পুড়ে গেছে। আমার মতো আরও ২০-২৫টি জিপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
আগুনের পর আকাশে মেঘের মতো গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আশপাশের করপোরেট কোম্পানির আবাসিক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা রিদুয়ানুল হক বলেন, ‘এক কঠিন মুহূর্ত পার করেছি। আগুন জ্বালাতেই ভয় লাগছে। বিদ্যুৎ নেই, অন্ধকার। অনেক পরিবারে সাহরি রান্না করা সম্ভব হয়নি।’
মুন্নী বেগম নামের একজন বলেন, ‘বসতি শেষ। ৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৩ লাখ টাকা পুড়ে গেছে। শুধু জীবন নিয়ে এক কাপড়ে বের হয়েছি।’
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের সুযোগে আশপাশের বিরোধপূর্ণ জমির ইটের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এক জমির মালিক মেহেদি হাসান বলেন, ভূমিদস্যু চক্রের সঙ্গে বিরোধ চলছে। অগ্নিকাণ্ডের সুযোগে নারীদের ব্যবহার করে দেয়াল ভাঙা হয়েছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘পাম্পটিতে কোনো অনুমোদন ছিল না। প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না। ১৪ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংক থেকে বিস্ফোরণের সূত্রপাত। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তবে কোনো প্রাণহানি হয়নি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তদন্ত কমিটি ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।’
