টাঙ্গুয়ার হাওর আর মেঘালয়ে বাকৃবিসাসের প্রকৃতি বিলাস

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

প্রকৃতি যেন রঙতুলিতে এঁকেছে তার অপার নৈসর্গিক দৃশ্যপট। নীলাভ জলরাশি, সবুজ পাহাড়, আকাশের সীমাহীনতা আর সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে দেশের প্রাকৃতিক রত্নভান্ডার টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে বের হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (বাকৃবিসাস) সদস্যরা। সাংবাদিক সমিতির ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের কার্যনির্বাহী কমিটির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বার্ষিক ভ্রমণে এবারের গন্তব্য ছিল অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া।

যাত্রা শুরু

‘নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল’ নামে পরিচিত এ হাওরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয় সন্ধ্যা ৭টায়। বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন সমিতির অফিসের সামনে থেকে যাত্রার শুরু। ময়মনসিংহ ব্রিজ মোড় থেকে আমাদের আসল যাত্রার সূচনা হয়। বাস ছাড়ে ৮টায়। বাসের ভেতরেই শুরু হয় খোশগল্প, আড্ডা আর অগ্রজ-অনুজদের মিষ্টি খুনসুটি। এবারই প্রথম সমিতির সঙ্গে আমার ভ্রমণে যাওয়া। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার সড়কপথ পাড়ি দিয়ে বাকৃবিসাসের সদস্যরা ভোর ৬টায় পৌঁছায় সুনামগঞ্জ শহরে। তখনো আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। চারদিকে ভোরের সোনালি আভা দেখতে দেখতে লেগুনায় চেপে রওনা হলাম সাহেববাড়ি ঘাটের উদ্দেশ্যে। এটি টাঙ্গুয়ার হাওরের মূল প্রবেশদ্বার।

হাওরের বুকে ভেসে থাকার গল্প

ঘাটে পৌঁছে দেখতে পেলাম রঙবেরঙের হাউজবোট। ছোট-বড়-মাঝারি সব রকমের হাউজবোট সারিবদ্ধভাবে রয়েছে। পূর্বেই বুকিং করা একটি হাউজবোটে উঠে পড়লাম। শুরু হয় হাওরের বুকে ভেসে থাকা। নীলাভ জলরাশি আর স্বচ্ছ আকাশের প্রতিচ্ছবিতে তৈরি হয় এক অনুপম ছন্দ। শহরের ক্লান্তি আর ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে। হাউজবোট ছেড়ে দেয় সকাল সাড়ে ৮টায়। প্রথম গন্তব্য ছিল হাওরের বুকে গর্বভরে দাঁড়ানো ওয়াচ টাওয়ারে। ওয়াচ টাওয়ারে সৌন্দর্য প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বোটযাত্রা শেষে টাওয়ারে পৌঁছানো। ওয়াচ টাওয়ারে যেতে ছোট নৌকা নেওয়া হলো। টাওয়ারে ওঠার আগে পাশের হিজল-করচের বাগানে থামে সাংবাদিকরা। হাওরের পানিতে প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি যাওয়া আর নীলাভ জলে নিজেদের সিক্ত করে নেওয়া। টাওয়ারের চূড়ায় দেখা মিলল হাওরের আসল সৌন্দর্য নীল জলরাশি, হালকা মেঘের ভেলা আর দূরে মেঘালয়ের চিরহরিৎ পাহাড়। সে এক অপরূপ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

নীলাদ্রি লেক ও লাকমাছড়া

পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা নীলাদ্রি লেক। মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় সবার চোখে-মুখে এনে দিল অন্যরকম প্রশান্তি আর বিস্ময়। কিছুক্ষণ অবস্থান ও ফটোসেশন শেষে সাংবাদিক দলটি রওনা হয় পাশের চিরহরিৎ লাকমাছড়ার উদ্দেশ্যে। কাদামাখা পথ আর পাহাড়ি ঢালু পাড়ি দেওয়া সব মিলিয়ে যেন অ্যাডভেঞ্চার অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যা নামলে বোটে ফিরে আসা। খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির গভীর নির্জনতায় ভেসে থাকা হাউজবোটে কাটে রাত। এ যেন প্রকৃতির কোলে ফিরে পাওয়া এক নতুন জীবন।

দ্বিতীয় দিনের শুরু ও শিমুল বাগান

সকালের মিষ্টি রোদে ঘুম ভাঙে। সকালের নাশতা শেষে রওনা হলাম তাহিরপুরের বিখ্যাত শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছে প্রবেশ করলাম সারিবদ্ধ শত শত শিমুল গাছের এক চিরহরিৎ রাজ্যে। সাংবাদিক দল ব্যস্ত হয়ে গেল সুন্দর মুহূর্তকে উপভোগ করতে।

বারেক টিলা ও যাদুকাটা নদী

শিমুল বাগান থেকে এবার যেতে হবে বারেক টিলাতে। পাহাড় কেটে তৈরি দৃষ্টিনন্দন সরু রাস্তা, চারপাশের সজ্জিত পরিবেশ। টিলার ওপরে উঠতেই ধরা দিল আসল নান্দনিকতা। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মেঘালয় পাহাড়। তাকে জড়িয়ে ছুটে চলেছে সাদা মেঘের ভেলা আর পর্বত চিড়ে নেমে আসা ঝরনার শব্দ হৃদয়ে আনে প্রশান্তি। টিলা থেকে নিচে তাকাতেই মিলল নীলাভ জলের মৃদু ঢেউয়ের যাদুকাটা নদী। এটিই দুই দিনের ভ্রমণের সর্বশেষ পর্যটন স্থান। সেখানে পৌঁছে লাইফ জ্যাকেট পরে সবাই নেমে পড়ে স্বচ্ছ, শীতল জলে।

ফেরার পালা

এখানেই ভ্রমণের সমাপ্তি, শুরু ফেরার পালা। ইশ আরও একটু থাকতে পারতাম। প্রকৃতির কাছাকাছিতে নিজেকে জানান দিতে। আমিও যে তাদের মতো নিস্তব্ধ কিন্তু প্রাণবন্ত, সজীব। চলতে চলতে রাত নেমে পড়ল। ঘাটে পৌঁছানোর পরে প্রিয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া। হাওরের নস্টালজিয়ার সুপ্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরতে থাকা। আর ভাবনায় বলতে থাকা ‘আবারও দেখা হবে কোনো এক গোধূলিলগ্নে’।

লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টার, কৃষি অনুষদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত