ইরানে শাসক বদলানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুগপৎ হামলা এবং ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা জবাবের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। উভয়পক্ষ যদি হামলা ও পাল্টাহামলায় সীমিত না থেকে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায়, আর তা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সামনে অনেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এবারকার যুদ্ধের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্র ইরানে শাসক বদলাতে চায়। এ কারণে ইরান শুরু থেকেই মরিয়া হয়ে লড়বে। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর আরেকটি যুদ্ধ আসতে পারে, এমন বিবেচনা থেকে দেশটি প্রস্তুতিও নিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনই (গতকাল) ইরান বলে দিয়েছে, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনো ‘সীমারেখা’ এবার মানবে না। এমন ঘোষণা দিয়েই বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। জর্ডানে হামলারও ঝুঁকি আছে। এভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে সমস্যা দেখা দেবে।
আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই ভঙ্গুর। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ আসে কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্নি স্থানে তেল-গ্যাসের চালানের বড় অংশ জাহাজযোগে যায় হরমুজ প্রণালী হয়ে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালী যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে একদিকে তেল-গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ও জনজীবন ব্যাহত হবে।
ইরানে বাংলাদেশি নাগরিক কম থাকলেও যুদ্ধ ছড়িয়ে গেলে অথবা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমন দেশগুলোয় বাংলাদেশের লাখ লাখ কর্মী আছে।
নিরাপত্তার জন্য তাদের অনেককে এদিক-ওদিক ছুটতে হতে পারে। দেশগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা যদি বিঘিœত হয়, তাহলে তাদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া দরকার হতে পারে। ১৫টি দেশ এরই মধ্যে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যেতে বলেছে। এমনকি পরিস্থিতির বেশি অবনতি হলে অনেক কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হতে পারে। অনেকে কাজ হারাতে পারে। কাজ আবার ফিরে না পেলে বেকার হয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের কর্মীদের অনেকে যদি বেকার হয়, তাহলে প্রবাসী আয় কমতে পারে। এতে দেশে তাদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। এসব ঠিক কী মাত্রায় হতে পারে, তা এখনই বলা মুশকিল। কিন্তু আশঙ্কা আছে।
এর বাইরে ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশ নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আকাশপথে চলাচল বিঘ্নিত হবে। খরচ বাড়বে। বাংলাদেশ বিমান এরই মধ্যে কয়েকটি দেশে ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অনেক কর্মী দেশে আটকে পড়তে পারে। সবমিলিয়ে এবারকার যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের উচিত, অনতিবিলম্বে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট প্রেসিডেন্ট
