মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম হতভম্ব হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এর জন্য তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি নতুন সরকারকে চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারকে পুঁজিবাজার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। বিশেষ করে কর ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং খাতে ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি।
গতকাল শনিবার সংস্থার কার্যালেয়ে ‘নতুন সরকার এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত : ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব মন্তব্য করেন গোলাম মোয়াজ্জেম। এর আগে তিনি অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় সিপিডির পক্ষ থেকে অভিবাদন জানানো হয়।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সিপিডি সচরাচর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক নিয়ে কথা বলে। তবে তা থেকে আজকের অনুষ্ঠান কিছুটা ভিন্ন। আজ আমরা নতুন সরকারের জন্য সামষ্টিক সূচকের পরিবর্তে খাতভিত্তিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছি।
নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি যে, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে ১৮০ দিনের কর্মসূচি তৈরি ও কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কর্মসূচির আলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকগণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনীতি খাতের সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা এবং এর জটিলতা অনেক ব্যাপক। পাশাপাশি দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসে খুব দ্রুত এসব সমস্যার অন্তর্নিহিত দিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক বুঝা ও সামাল দেওয়া সহজ না। এর সমাধানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী উপদেষ্টা এবং প্রশাসকদের সময় নিয়ে সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান তাতে কোনো দ্বিধা নেই। সেজন্য শুরুতে ১৮০ দিনের কর্মসূচি দিয়ে শুরু করছে, তবে আমরা যেটা মনে করি, ১৮০ দিন যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক যে সব সমস্যা রয়েছে তা ১৮০ দিন নয়, আগামী ৫ বছর দরে সামাল দিতে হবে। ফলে সরকারপ্রধানকে সে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে মাথায় রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যখন শুল্কসংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছিল, তখন আমাদের, সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়া হলো শুধু শুল্ক বিষয়ে (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) আলোচনা চলছে। সেটা ৩৫ শতাংশ থেকে কীভাবে ২০ শতাংশে নামিয়ে আসার গল্প। সেজন্য কিছু কিছু বিষয়ে চুক্তি করলেই সমাধান হয়ে যাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু যে চুক্তিটা এলো এটি দেখে আমরা হতভম্ভ হয়ে গেলাম। আমরা শঙ্কিত হয়ে গেলাম। এ ধরনের একটি চুক্তি কীভাবে একটি অনির্বাচিত সরকার করে যেতে পারে। এর দায় কীভাবে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দিয়ে যেতে পারে। আমার মনে হয়, কোনো একটি বিষয়ে যদি অন্তর্বর্তী সরকারকে নিন্দা জানানোর কথা বলা হয়, এই চুক্তির জন্য নিন্দা জানাতে চাই। প্রথমত. চুক্তিতে বলা হয়েছে যৌথভাবে ৬০ দিনের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবেন। দ্বিতীয়ত. চুক্তিতে বলা আছে, উভয়পক্ষ চুক্তির সব নোটিফিকেশন পর্যালোচনা শেষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে কার্যকারিতা শুরু হবে। এর কোনোটি আমরা এখন পর্যন্ত শুরুই করিনি। তৃতীয় বিষয়টি হলো তাদের দেশের উচ্চ আদালতের রায়ে শুল্ক আরোপ অবৈধ বলা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, এই শুল্ককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল দেশকে বৈষম্যমূলক চুক্তিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি তাদের চুক্তির কৌশল হতে পারে। ফলে আমরা বলতে চাচ্ছি, এ ধরনের বৈষম্যমূলক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে, উভয় দেশ কীভাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, সে দিকে এগিয়ে আসা দরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, এটি সরকারের ‘দুর্বল পদক্ষেপ’। একইসঙ্গে প্রক্রিয়াটিকে অস্বচ্ছ বলেও মন্তব্য করেছেন গোলাম মোয়াজ্জেম। তবে আগামীতে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদ- নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
দেশের আর্থিক খাতের দুর্নীতির প্রসঙ্গে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাধা দুর্নীতি, প্রতিকারে কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়। এ জন্য দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে। দুর্নীতি রোধে আমরা কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল নিয়োগের কথা বলছি। যত দ্রুত সম্ভব সরকারের নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মনে করছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে আমরা দেখেছি। এশিয়ার মধ্যে আমাদের রাজস্ব জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এই মুহূর্তে। এখানে বিএনপি সরকার রাজস্বের টার্গেটে ৪ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়, এটা আমাদের বাস্তবসম্মত হয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ যা ১৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় সম্পদ কর যুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। এক্ষেত্রে কর ন্যায্যতা যেন মাথায় রাখেন সেটা আমরা বলতে চাই।
