ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অটল প্রতীক, সর্বোচ্চ নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সৈয়দ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম রবিবার (১ মার্চ) ভোরে এই খবর নিশ্চিত করেছে।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইসলামী বিপ্লবের নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সৈয়দ আলী খামেনি আমেরিকা ও জায়োনিস্ট শাসনের যৌথ হামলায় শনিবার সকালে নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা করেন, খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ ইরানি নেতারা যৌথ অভিযানে নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘খামেনি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে পালাতে পারেননি।’
ট্রাম্প আরও জানান, ইরানে বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকবে এবং এটি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে চালানো হচ্ছে। তিনি ইরানি জনগণকে সরকার দখলের আহ্বান জানান।
খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। খোমেনি বিপ্লবের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করলেও খামেনিই ইরানকে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ‘মস্তক না নোয়ানোর’ নীতিতে অটল রাখেন। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাককে সমর্থন দেওয়া তার যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করে।
তার নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলেন এবং পশ্চিমের সঙ্গে আলোচনায় সন্দেহ পোষণ করেন। তার দৃষ্টিতে ইরানকে সবসময় বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী অবস্থায় থাকতে হবে।
খামেনির শাসনকালে একাধিক চ্যালেঞ্জ এসেছে। ২০০৯ সালে গ্রিন মুভমেন্টের বিক্ষোভ, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নারী অধিকারের আন্দোলন এবং সম্প্রতি অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করা হয়। তিনি এসবকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতেন।
জন্ম ১৯৩৯ সালে মাশহাদে। পিতা ছিলেন বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা। তিনি কুরআন, ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭৯-এর বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮১ সালে বিরোধী গোষ্ঠীর হামলায় ডান হাত অকেজো হয়।
তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত অবদান ‘প্রতিরোধের অক্ষ’- হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি, সিরিয়া ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীসহ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে।
খামেনির মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে এসেছেন। তবে এই শোকের মধ্যেই তেহরানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে।’
একদিকে বিদেশি হামলা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা- সব মিলিয়ে আলি খামেনির পরবর্তী ইরান এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
সূত্র: আল-জাজিরা
