পবিত্র রমজান ইবাদত ও আত্মসংযমের মাস। মহান আল্লাহ এ মাসে সব আমলের প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। নবীজি (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমতুল্য। আর রমজানের একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমতুল্য।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস ৩৩৩৬) মহান আল্লাহ আমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় রোজার ফজিলত অনেক বেশি। রোজার বিশেষ দশটি অতুলনীয় ফজিলত সম্পর্কে বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
অতীতের পাপ মোচন : রমজানের রোজা অতীতের গুনাহ থেকে ক্ষমা পেতে সহায়তা করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের সমস্ত (ছগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮)
গুনাহের কাফ্ফারা : রোজা এক রমজান থেকে আরেক রমজান পর্যন্ত ছগিরা গুনাহের জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান, এ সময়গুলোর মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়, যদি কবিরা গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৩)
রোজা অতুলনীয় ইবাদত : রোজা এমন ফজিলতপূর্ণ আমল, ইবাদতে যার কোনো সমতুল্য নেই। হজরত আবু উমামা বাহিলি (রা.) বলেন, আমি নবীজি (সা.)-কে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।’ তিনি বললেন, ‘তুমি রোজা রাখো, কেননা (মর্যাদায় ও ফজিলতে) এর সমতুল্য আর কিছু নেই।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস ২২২০)
জান্নাতের বিশেষ দরজা : রোজাদার ব্যক্তিদের জন্য মহান আল্লাহ জান্নাতে বিশেষ একটি দরজা তৈরি করে রেখেছেন, যে দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররা জান্নাতে যেতে পারবে। হজরত সাহল ইবনে সাআদ সায়েদি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে, যা দিয়ে কেবল রোজাদার ব্যক্তিরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। রোজাদাররা প্রবেশ করার পর সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ৭৬৫)
আল্লাহ যে পুরস্কার দেবেন : রোজা এমন গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের নেকি দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। তবে রোজা ছাড়া, কেননা রোজা আমার জন্য, আর আমিই তার প্রতিদান দেব। কারণ সে (রোজাদার) আমার উদ্দেশ্যেই নিজের কামনা-বাসনা ও আহার পরিত্যাগ করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, ১১৫১)
দৈহিক সুস্থতা লাভ : রোজা রাখলে শারীরিকভাবে সুস্থতা অনুভূত হয়, এটা বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। যাদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, রোজা তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিহাদ করো, গনিমত লাভ করবে। রোজা রাখো, সুস্থতা লাভ করবে এবং সফর করো, ধনী হতে পারবে।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস ৮৩১২)
জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢাল : রোজাদার ব্যক্তিদের জাহান্নাম থেকে মুক্তির অসিলা হবে রোজা। হজরত ওসমান ইবনে আবুল আস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢাল স্বরূপ।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস ২২৩০)
রোজাদারের মুখের গন্ধ : দুর্গন্ধ স্বভাবতই অপছন্দের হয়। কিন্তু রোজা রেখে সারা দিন উপোস থাকার ফলে মানুষের মুখে যে গন্ধ সৃষ্টি হয়, তা মহান আল্লাহর কাছে মেশকে আম্বরের চেয়েও বেশি প্রিয়। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, রোজাদারের মুখের (উপোসজনিত) গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকে আম্বরের চেয়ে বেশি প্রিয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৭১৭৪)
এই হাদিস থেকে জনমনে একটা ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, রোজাদারের মুখের গন্ধ যেহেতু আল্লাহর প্রিয়, তাই রোজা রেখে মেসওয়াক বা অন্য কোনোভাবে দাঁত পরিষ্কার করা যাবে না। এমন ধারণা সঠিক নয়। কারণ আল্লাহর কাছে প্রিয় হলো উপোসজনিত গন্ধ, যা পাকস্থলীতে সৃষ্টি হয়। দাঁতে কিংবা মুখে ময়লা থাকার কারণে যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, তা আল্লাহর কাছেও অপছন্দনীয়। কারণ মহান আল্লাহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন।
মহান রবের সাক্ষাৎ : পরকালে রোজাদার ব্যক্তি মহান আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘রোজাদারের রয়েছে দুইটি আনন্দ, একটি হচ্ছে (দুনিয়াতে) ইফতারের সময়, অপরটি হচ্ছে (পরকালে) মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৪৯২)
রোজার সুপারিশ : পরকালে রোজা বান্দার জন্য মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘‘হে আমার রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছিলাম, অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।’ আর কোরআন বলবে, ‘আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছিলাম, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।’ ফলে উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।’’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৬৬২৬)
মহান আল্লাহ রমজানের রোজায় আমাদের জন্য যে প্রতিদান রেখেছেন, যা যথাযথভাবে লাভ করার জন্য রোজার আদব রক্ষা করতে হবে, রোজার হক আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহর আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
