শিল্প-সাহিত্যে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে রমজান

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:৪০ এএম

জহির উদ্দিন বাবর প্রায় দুই দশক ধরে লেখালেখিতে সক্রিয়। মূলধারার গণমাধ্যমে বার্তা বিভাগে কাজ করছেন প্রায় এক যুগ ধরে। বর্তমানে অনলাইন নিউজপোর্টাল ঢাকা মেইলের প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরামের সাবেক সভাপতি। লেখা ও লেখকের কথা নিয়ে প্রকাশিত সাময়িকী লেখকপত্রের সম্পাদক। তার প্রকাশিত লিখিত ও অনূদিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। আলেম সাংবাদিক জহির উদ্দিন বাবর রমজান ও সমাজের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সা ক্ষা ৎ কা র

দেশ রূপান্তর : রমজান মাসে যে পরিমাণ সহমর্মিতার চর্চা হয়, বাকি ১১ মাসে সেটা কেন ধরে রাখা যায় না? এর কারণ কী? এটা ধরে রাখার জন্য কী কী করা যেতে পারে?

জহির উদ্দিন বাবর : পবিত্র রমজান মাসকে হাদিসে ‘শাহরুন মুয়াসাত’ বা ‘সহানুভূতির মাস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই এই মাসে মানুষের মধ্যে সহানুভূতির উদ্রেক হয়। বাকি ১১ মাসের তুলনায় এই মাসে সাধারণত মানুষের মধ্যে দান-সদকা, গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি সহানুভূতি বা কোমল আচরণ বেশি প্রদর্শন করতে দেখি। রমজানে সবার অন্তরই সাধারণত অপেক্ষাকৃত কোমল থাকে। এটার বড় কারণ হলো, রমজান মাসের আবহ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষের মধ্যে কিছু গুণের সমাহার ঘটায়। রমজানে কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত থাকার কারণে সুন্দর গুণগুলোর বিকাশই চোখে পড়ে। বাকি ১১ মাস সেই গুণগুলোর অনেক কিছু আমরা অনুপস্থিত দেখি। এর মধ্যে সহানুভূতিও একটি। এর বড় কারণ হলো, রমজানের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে আমরা বাস্তব জীবনে কমই প্রয়োগ করে থাকি। অনেকের ধারণা, দান-সদকা, সহানুভূতি প্রদর্শন, মানুষের সঙ্গে সদাচার বা কোমল আচরণ, এসব বোধহয় শুধু রমজানেই করতে হয়। এ জন্য রমজানের শিক্ষা বাকি ১১ মাসও ধরে রাখার প্রত্যয় থাকতে হবে প্রত্যেক রোজাদারের মধ্যে। তাহলেই রমজান ছাড়া অন্য মাসগুলোতেও আমরা সহানুভূতিসহ অন্যান্য গুণ মানুষের মধ্যে দেখতে পাব।

দেশ রূপান্তর : লেখালেখি ও সাহিত্যে রমজানের প্রভাব কতটুকু? মনীষী আলেমদের লেখালেখিতে রমজান কীভাবে এসেছে?

জহির উদ্দিন বাবর : রমজান শুধু ইবাদতই নয়, আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশও। রমজানের আবহ আমাদের জীবনযাত্রা পাল্টে দেয়। সারা বছর পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিটিও রমজান এলে সুপথে চলার চেষ্টা করে। এমনকি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে এদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে রমজান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাস। আবহমান কাল ধরে রমজান আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখনীতে রমজানকে তুলে ধরেছেন নানাভাবে। নজরুল-ফররুখ থেকে শুরু করে আধুনিক কবিরা পর্যন্ত রমজানের ওপর লিখেছেন ছড়া-কবিতা। কথাসাহিত্যিকরা রমজানকে তুলে ধরেছেন নানা আঙ্গিকে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রোজার স্থান রয়েছে। এখনো রমজানকেন্দ্রিক প্রচুর লেখালেখি অব্যাহত আছে। ইসলামি সাহিত্যে রমজানের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মনীষী আলেমদের লেখালেখিতেও অনিবার্যভাবে রমজানের প্রসঙ্গ এসেছে। যেহেতু রমজান ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, এ জন্য ফিকহের কিতাবাদিতে রমজানের ওপর দীর্ঘ আলোচনা স্থান পেয়েছে। রোজা কীভাবে রাখতে হবে, প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল, রোজার উপকারিতার নানা দিক এবং অপরিহার্য এই ইবাদতটির মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব, এসব দিকে বেশি ফোকাস করেছেন মনীষী আলেমরা। রমজানের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা আমরা তাদের লেখনীতে পাই। আলেমদের মধ্যে এখন যারা লেখালেখি করছেন তারা রমজানকে যুগ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন। রোজার বৈজ্ঞানিক দিকটিও তাদের লেখায় উঠে আসছে। এতে সর্বসাধারণ রমজান ও রোজার সময়োপযোগী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাচ্ছে। যা তাদের সঠিকভাবে রোজা পালনের পথ সুগম করছে।

দেশ রূপান্তর : মিডিয়ায় রমজান নিয়ে যেসব কনটেন্ট হচ্ছে, একজন আলেম সাংবাদিক হিসেবে আপনার কি মনে হয়, তা যথেষ্ট? এই বিষয়ে আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে?

জহির উদ্দিন বাবর : আমাদের গণমাধ্যমে এখন রমজান নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। যেহেতু দিন দিন গণমাধ্যমের বিস্তৃতি ঘটছে এবং নানা আঙ্গিকের গণমাধ্যম সৃষ্টি হচ্ছে, সবখানেই কমবেশি রমজানের আলোচনা স্থান পাচ্ছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। জনসাধারণ এসবের মাধ্যমে জানতে ও শিখতে পারছে। তবে আমি মনে করি, এখনো গণমাধ্যমে রমজান প্রসঙ্গে আলোচনায় ঘাটতি আছে। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে রমজানের ওপর নিয়মিত কলাম এবং সপ্তাহে বা প্রতিদিন পাতা প্রকাশিত হলেও অনেকটা দায়সারা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেশিরভাগ পত্রপত্রিকায় গৎবাঁধা কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। বিষয় ও আলোচনায় তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই। এতে নতুনত্ব এলে পাঠক বেশি উপকৃত হবে বলে আমি মনে করি। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া কিংবা ভিজুয়াল মাধ্যমেও রমজানের আলোচনা ততটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এর নানা কারণ রয়েছে। যারা আলোচনা করছেন তাদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ না। আবার অভিজ্ঞ হলেও তাদের উপস্থাপনা আকর্ষণীয় না। ভিজুয়াল মাধ্যমেও রমজানের আলোচনায় বিষয়-বৈচিত্র্যের ঘাটতি চোখে পড়ে। সব মিলিয়েই বলা যায়, গণমাধ্যমে রমজানকে যুগ চাহিদার আলোকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এখন দ্বীনকে জানার ও বোঝার প্রবণতা অনেকটা বেড়েছে। এই শ্রেণিটির কাছে রমজানের মতো ইসলামের অপরিহার্য বিধানগুলো বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারলে অনেক বেশি উপকৃত হবে। এ জন্য একদিকে গণমাধ্যমকে রমজানের আলোচনার ওপর জোর দিতে হবে, অন্যদিকে এসব আলোচনা যেন রুচি-বৈচিত্র্যের বিচারে উত্তীর্ণ হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : তারাবি, ইফতার ও সাহরিকে ঘিরে যে আড়ম্বর দেখা যায়, এর সঙ্গে রমজানের মৌলিক শিক্ষা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

জহির উদ্দিন বাবর : গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আপনি আলোকপাত করেছেন। আমাদের দেশে রমজানে তারাবি, ইফতার ও সাহরি ঘিরে আড়ম্বর দেখা যায়, এটা সত্য। প্রথমত তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে একটা বিতর্ক প্রতিবার রমজানেই সামনে আসে। এটা নিয়ে বিভক্তি ও বিরোধও চোখে পড়ে। আমাদের বেশিরভাগ মসজিদেই খতমে তারাবি হয়। কিন্তু সিংহভাগ মসজিদে এত দ্রুততার সঙ্গে তেলাওয়াত করা হয় যে, অনেকাংশে কোরআনের মর্যাদাহানি ঘটে। এমনকি কোথাও কোথাও বিকৃত উচ্চারণেও তেলাওয়াত করা হয়। এটা একদমই উচিত নয়। খতমে তারাবি পড়তে হলে ধীরস্থিরভাবে কোরআনের মর্যাদা রক্ষা করে তেলাওয়াত করতে হবে। প্রয়োজনে সুরা তারাবি পড়া যেতে পারে, তবু কোরআনের বিকৃত উচ্চারণে খতমে তারাবি পড়া যাবে না। অন্যদিকে সাহরি ও ইফতার ঘিরে আমাদের দেশে আড়ম্বরের কোনো শেষ নেই। রমজানে ইফতার ও সাহরিতে নানা আয়োজন থাকে। সেখানে প্রচুর পরিমাণে অপচয় হয়। এসব আয়োজনেই একটা খাই খাই ভাব ফুটে ওঠে। অথচ রমজানের মূল শিক্ষা হলো সংযম। আপনি সারাদিন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রেখে এবং জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থেকে যে সংযম প্রদর্শন করছেন, সেটা যেন সাহরি ও ইফতারে কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া না হয়। সাহরি ও ইফতারে বাহারি আয়োজনে কোনো বাধা নেই, তবে সেটা যেন অপচয়ে পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তা ছাড়া যে সংযম রোজার প্রকৃত শিক্ষা, সেটার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু করা যাবে না।  

দেশ রূপান্ত : হুজুগে মানসিকতা কি ডিজিটাল যুগে আরও তীব্র হয়েছে? এর পেছনে কী কারণ দেখেন? উত্তরণের উপায় কী?

জহির উদ্দিন বাবর : হ্যাঁ, অবশ্যই হুজুগে মানসিকতা ডিজিটাল যুগে আরও তীব্র হয়েছে। এখন মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। এতে সারা পৃথিবীই তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। মানুষ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। নিঃসন্দেহে এটা স্রষ্টার অনেক বড় দান। কিন্তু আমরা এই সুযোগটি ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করছি কজনে! বিশেষ করে, জাতিগতভাবে আমাদের একটা বদনাম আছে, আমরা হুজুগে জাতি। কোনো কিছু পেলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই আমরা তা ছড়িয়ে দিতে অভ্যস্ত। অথচ একজন প্রকৃত মুসলমান এই কাজটি কখনো করতে পারে না। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, যা শোনা তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া বলা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের প্রতিনিয়ত মিথ্যাবাদী বানাচ্ছে। আমরা আমাদের খেয়াল-খুশি মতো যা পাচ্ছি তাই শেয়ার করছি। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের একটুও প্রয়োজন বোধ করছি না। এতে সমাজে বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা এমনকি কখনো কখনো তা সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হলেই কেবল এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : কুৎসা, গুজব ও আক্রমণাত্মক সংস্কৃতি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?

জহির উদ্দিন বাবর : একটি সমাজকে বিষিয়ে তোলার জন্য কুৎসা, গুজব ও আক্রমণাত্মক সংস্কৃতিই যথেষ্ট। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এসব অনাচার দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে, গুজব ছড়িয়ে বন্যসুখ লাভ করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এই চর্চাটি বেশি হচ্ছে। কারণে-অকারণে আমরা মানুষের মানহানি করছি। একটি দেশ ও জাতির জন্য এ ধরনের সংস্কৃতি খুবই ভয়াবহ। প্রত্যেকের উচিত এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভয়াবহ এই সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করতে হলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে বিবেক-বিবেচনাবোধ দান করেছেন। আমরা অনেকেই শিক্ষার আলোয় আলোকিত। আবার একটা বড় অংশ ইসলামকে জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। এই যে বিবেক-বিবেচনা, শিক্ষা কিংবা ইসলাম, কোনোটিই কিন্তু কুৎসা, গুজব ও আক্রমণাত্মক

সংস্কৃতিকে সমর্থন করে না। বিবেক-বিবেচনা থাকার পরও কোনো শিক্ষিত মানুষ এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে বুঝতে হবে, তার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের অভাব রয়েছে। আর ইসলামের ধারক-বাহক হওয়া সত্ত্বেও যারা এসবে যুক্ত তাদের তো সত্যিকারের মুসলিম বলার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এসব অপকর্ম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত