মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় চট্টগ্রামের পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত দুই দিন ধরে বেড়েছে গ্রাহকদের ভিড়। আজ শনিবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি গ্রাহকেরা। তবে কিছু পেট্রোল পাম্পে অকটেন ছাড়া ডিজেল বিক্রি হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পাম্প মালিকদের বক্তব্য, বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা শুক্রবার রাত থেকে থেকে তাদের তেল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তারা গ্রাহকদের বিশেষ করে বাইক চালকদের অকটেন সরবরাহ দিতে পারছেন না৷
চট্টগ্রাম শহরের কাজির দেউরি এলাকায় পারিবারিক কাজে যেতে নিজের বাইক নিয়ে শনিবার দুপুরে বের হন হাটহাজারী মদুনাঘাট এলাকার বাসিন্দা আমজাদ আলী। তিনি স্থানীয় বড়দিঘির পাড় ইসলাম ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে গিয়ে দেখেন-সেখানে 'তেল নেই' সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরপর তেল পাওয়ার আশায় তিনি বাইক নিয়ে দ্রুত ছুটে যান নতুনপাড়া এলাকায় বিআরটিসি ফিলিং স্টেশনে। সেখানেও গিয়ে দেখেন বাইক চালকদের দীর্ঘ লাইন৷ কিন্তু পাম্পে তেল নেই।
পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩ দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় গ্রাহকদের মধ্যে জ্বালানি তেলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার রাত থেকে এই চাপ মাত্রা ছাড়িয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। তারা এও জানান, যেসব গ্রাহক আগে ৫০০ টাকার জ্বালানি নিতো, তারা এখন ২ থেকে ৩ গুণ বেশি পরিমাণ তেল দাবি করছেন।
নতুন পাড়া এলাকায় বিআরটিএ কার্যালয় সংলগ্ন বিআরটিসি ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা জমির উদ্দিন বলেন, "শুক্রবার রাতে বাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন চালকেরা অহেতুক চাহিদার তুলনায় বেশি তেল কিনেছেন। বেশি বিক্রি হওয়ায় মজুদ ফুরিয়ে গেছে। অন্যদিকে কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।"
শনিবার বিকেল ৩টা। নগরের অক্সিজেন এলাকায় 'ওয়াজেদ এন্ড সন্স' ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে যেন উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। বাস্তবে কোনো উৎসব নয়। তেলের অদৃশ্য সংকটের আশঙ্কায় কয়েক'শ যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লেগে আছে। অ্যাম্বুলেন্স, ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে শত শত মোটরসাইকেল, সবাই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে তেলের নজেলের দিকে। সবার লক্ষ্য একটাই, যেকোনো মূল্যে তেল কিনবেন তারা। কিন্তু সংকটের অজুহাতে তেল দিচ্ছেন না পাম্পে নিয়োজিত কর্মচারীরা।
দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স চালক মোহাম্মদ এরশাদ বলেন, 'চারদিকে খবর রটেছে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু। যদি পাম্প শুকিয়ে যায় তবে তো গাড়ির চাকা আর ঘুরবে না। মানুষের জীবন বাচাঁনো মুশকিল হয়ে পড়বে।'
সেখানে একই চিত্র দেখা গেল মোটরসাইকেল চালক জামশেদের ক্ষেত্রেও। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং করে যার সংসার চলে তাঁর কাছে এক লিটার তেল মানেই কয়েকশ টাকার রুটি রুজি। প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি তেলের দেখা পাননি। জামশেদের আতঙ্ক আরও গভীর কারণ তিনি শুনছেন জাহাজ আসছে না এবং যুদ্ধ লেগেছে। "আমাদের মতো গরিব মানুষের তো ঘরে জমানো টাকা নেই, তেল না থাকলে কাল না খেয়ে থাকতে হবে" বলেন জামশেদ।
চট্টগ্রাম নগরের গণিবেকারি এলাকায় কিউসি ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক মীর খান মোবাইল ফোনে দেশ রুপান্তরকে জানান, তাঁদের স্টেশনে স্বাভাবিক দিনে যেখানে ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হয়, সেখানে গত তিন দিন ধরে তা ২০ হাজার লিটার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ চাহিদাকে ছাপিয়ে গেছে আতঙ্কিত মানুষের অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা।
নগরের প্রবর্তক মোড়ের আলহাজ ফয়েজ আহমদ অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের চাহিদাও গত দুদিনে প্রায় ৩ হাজার লিটার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, "মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। যাদের ৫ লিটার দরকার তারা ১০ লিটার চাইছে, এই বাড়তি চাহিদা সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।" সরকারি তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে ৯ দিনের, অকটেন ১৫, পেট্রোল ৮, ফার্নেস অয়েল ৬০, জেট ফুয়েল ৩৬ ও মেরিন ফুয়েল ৪২ দিনের।
