মানুষের জীবন সবসময় আনন্দের ধারায় প্রবাহিত হয় না। সুখের পাশাপাশি দুঃখ, প্রাপ্তির পাশাপাশি বঞ্চনা এবং আশার সঙ্গে নিরাশাও জীবনের স্বাভাবিক অংশ। মানুষ যখন নিজের আশা ও স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ হতে দেখে, তখন তার হৃদয়ে প্রশান্তি জন্ম নেয়। আর যখন সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, তখন মন ভরে ওঠে হতাশায়। এই হতাশা মানুষের মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলে। কখনো তা ক্ষণিকের অস্বস্তি, আবার কখনো তা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণায় রূপ নেয়। এছাড়া কখনো ব্যর্থতা, কখনো প্রিয়জনের প্রতারণা, কখনো দীর্ঘ অসুস্থতা, আবার কখনো অপ্রত্যাশিত ক্ষতি মানুষের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের ভেতরে হতাশা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনদৃষ্টি অন্যরকম। তিনি জানেন, এই পৃথিবী পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে সুখ যেমন আছে, তেমনি আছে কষ্টের মুহূর্তও। তাই মুমিন ব্যক্তি বিপদের মুহূর্তকে নিছক দুর্ভাগ্য বলে মনে করেন না, বরং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেন।
যে ব্যক্তি জীবনের এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে, তার জন্য হতাশা স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে না। বরং ধৈর্য, ইমান ও আল্লাহর প্রতি আস্থাই তাকে কঠিন সময় পার হওয়ার শক্তি জোগায়। ফলে বিপদ-বিপর্যয়ের মাঝেও সে আশা ও দৃঢ়তার পথ খুঁজে পায়।
আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি বান্দাদের বিভিন্ন বিপদ-বিপর্যয় দ্বারা ধৈর্যের পরীক্ষা করবেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আমি তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারা ১৫৫)
বিপদ-বিপর্যয়ে মুমিন ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে। এটা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই হতাশা মুমিন ব্যক্তিকে স্পর্শ করতে পারে না। কেননা আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার জীবনে দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। মুমিন ব্যক্তি তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সবসময় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। তাই মুমিন ব্যক্তির জন্য বিপদ-বিপর্যয়ে ধৈর্য ধারণ করা সহজ হয়ে যায় এবং ধৈর্য ধারণ করে তারা সফলকাম হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে।’ (সুরা মুমিনুন ১)
আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন বিপদ-বিপর্যয়ের দ্বারা সব মানুষেরই পরীক্ষা নেবেন। পরীক্ষা হবে যার যার ইমান অনুসারে। যে যত বড় প্রিয় বান্দা তার পরীক্ষাও হবে তত কঠিন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, বিপদাপদ ও বালা মুসিবত নবীদের প্রদান করেন। তারপর যারা ইমান ও আমলে নবীদের পরের স্তরের। তারপর যারা তাদের পরের স্তরের। (মুসনাদে আহমাদ)
মানবজীবনে বিপদ-বিপর্যয়কে অপ্রত্যাশিত মনে করলে ধৈর্য ধারণ করা কঠিন হয়ে যায়। যদি প্রত্যাশিত মনে করা হয়, তাহলে তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর মুমিন ব্যক্তির কাছে তা খুবই স্বাভাবিক।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার