যখন সবাই জানে যে, যে লোকটা চলে যাচ্ছে তার সঙ্গে জীবনে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং সে আর কোনো কাজে আসবে না, তখন সে যেন কখনো আসেনি এমনভাবে বিদায় দেওয়াটাই বোধহয় রেওয়াজ। অন্তত বুদ্ধিমানরা তাই করে। এবং কে না জানে যে ইরানিরা বুদ্ধিমান। অবশ্য তেহরানে এ বিষয়ে দুয়েকজন হদ্দ বোকার দেখা যে পাইনি তাও নয়।
কাজেই পারস্য ত্যাগের কদিন আগে আলী যখন আমাকে বিদায়ী ডিনারের আমন্ত্রণ জানালো তখন অবাকই হলাম। কেননা তাকে আমি বুদ্ধিমান হিসেবেই জানতাম। সে সহজে কারও সঙ্গে মিশত না, বাংলাদেশিদের সঙ্গে তো নয়ই। অফিস আর বাসা, বাসা আর অফিস, এই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। সে বলত যে তার বৃদ্ধা মাতা শয্যাশায়ী, সেজন্য অন্য কিছুতে সময় দিতে পারে না। অফিস থেকে ফিরেই মায়ের পরিচর্যা করতে হয়। সেটা খুবই সম্ভব, কেননা সে বিয়ে করেনি, ষাট ছুঁইছুঁই জীবনে বোধ করি আর সে সম্ভাবনাও নেই। অন্তত তার দিকে থেকে কোনো তাড়া আছে বলে কখনো মনে হয়নি। সব মিলিয়ে আলী নিজেকে নিয়েই সম্পূর্ণ, বা বলা যেতে পারে তৃপ্ত, কেননা অন্যের সঙ্গ লাভের জন্য তাকে কখনো তৃষিত মনে হয়নি।
কাজেই ডিনারের দাওয়াতে আমি যেমন অবাক হলাম, অবাক হলো ইরানিরাও। ওই যে বললাম দুয়েকজন বোকার দেখাও পেয়েছিলাম, যারা আমার ইরানে অবস্থান সহজ করে তুলতে যারপরনাই চেষ্টা করেছিল, তাদেরই একজন খবরটা শুনে হাফাতে হাফাতে এসে বলল, ‘স্যার, আলী নিশ্চয়ই আপনাকে খুব পছন্দ করে।’
‘কীভাবে বুঝলে?’
‘এর আগে তো দূতাবাস থেকে কত কাউন্সেলরই বিদায় নিয়ে গেল, কিন্তু সে কাউকে এ রকম দাওয়াত করেনি।’
‘তাই? আমার সৌভাগ্য।’ আমি যে খুশি হয়েছি তা প্রকাশ পেলেও, যেন গদগদ না দেখায় তার যথাসাধ্যি চেষ্টা করলাম।
আলী যে শৌখিন, সেটা জানতাম। তেহরানের সবচেয়ে জমকালো হোটেল পছন্দ করার মধ্য দিয়ে সে সেটাই আবার প্রমাণ করল। যে কোনো পোশাকেই তাকে স্মার্ট দেখায়; আজকের সন্ধ্যায় গাঢ় নীল স্যুটে তার সাজ দেখে মনে হচ্ছিল যেন ফটোগ্রাফির বই থেকে কোনো পুরুষ মডেল উঠে এসেছে। কিন্তু চোখ দুটি আগে যে রকম দেখেছি সে রকমই বিষণœ, সে রকমই বিষাদের চাদরে ঢাকা। যেন তার অভিধানে আনন্দ বলে কোনো শব্দ নেই, উল্লাস তো দূর কি বাত।
স্যুপ পর্বের পর আমরা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ক্যাভিয়ার আর ফেসেনজু খেলাম। যেহেতু আলী নিমন্ত্রণকারী, সেই বিভিন্ন পদ ঠিক করল। ফেসেনজু ইরানের বিখ্যাত খাবার, কিন্তু আমার তত ভালো লাগে না। আলী বোধহয় সেটা জানত না। ইরানে প্রচুর ডালিম হয়। ফেসেনজু হলো ডালিমের রস দিয়ে অনেক পরিশ্রম করে মুরগির মাংস রান্না। আমার কম পছন্দের কারণ স্বাদ নয়, খাবারটি যথেষ্ট সুস্বাদু এবং দামি; আমার আপত্তি এটা রান্নার জন্য যে পরিশ্রম আর সময় ব্যয় হয়, সেটা নিয়ে। এর চেয়ে কম আয়োজনে অন্য অনেক সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত করা সম্ভব।
স্যুপ খেতে খেতে আমরা একটু গল্প করছিলাম। গল্প মানে কোন বিমানে ফিরছি, পথে ট্রানজিট আছে কিনা, দেশে ফিরে কোথায় কাজ করব, এ ধরনের টুকটাক কথাবার্তা। আমি গল্প জমাতে পারি না, আর আলী যেন ঝুনা নারিকেল, ওর ভেতরের পানি আর শাস বের করতে হলে পাকা জহুরি দরকার; দুর্ভাগ্যক্রমে আমি তা নই। ফলে আলাপ জমবে না, সেটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু আমার মনের ভেতর কোথায় যে মাঝে মাঝে আশার বিদ্যুৎ খেলছিল, আজ হয়তো সে নিজেকে তুলে ধরতেও পারে।
খাওয়ার মাঝেই একসময় আলী নীরব হয়ে যায়। ছুরি কাঁচি দিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করে আর মাঝে মাঝে মুখে দেয়। মাথা নিচু, দৃষ্টি প্লেটের দিকে নিবদ্ধ। বুঝতে পারছিলাম সে কিছু ভাবছে। বেশ কয়েক মিনিট পর আচমকাই মুখ তুলে প্রশ্ন করে,
‘জানুস’ গল্পটা পড়েছেন স্যার?
‘কোন গল্প? কার লেখা?’
‘অ্যান বিয়েতির লেখা। গ্রিক দেবতার নামে গল্পটার নাম।’
গল্পটা পড়েছি বলে মনে করতে পারলাম না। তবে গ্রিক মিথলজির উল্লেখ থেকে মনে পড়ল, জানুস সেই দেবতার নাম যার দুটো মাথা, এক মুখ দিয়ে সে অতীতের দিকে তাকায় আর একমুখ থাকে ভবিষ্যতে। কিন্তু আলীর সঙ্গে এ গল্পের সম্পর্ক কী? তার অতীত বিষয়ে আমি তেমন একটা জানি না আর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সে খুব আগ্রহী সেটাও কখনো মনে হয়নি।
আলী আবার মাথা নিচু করল। আমি নিশ্চিত মুখ তোলা থাকলেও আমি তার চোখ পড়তে পারতাম না। তার পর্দা ভেদ করা ছিল রীতিমতো অসম্ভব। কেবল তার আঙুলগুলোকে একটু অস্থির মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সে বলল,
‘স্যার, আপনি একদিন জানতে চেয়েছিলেন না, আমি কেন বিয়ে করি নি?’
‘হ্যা। আমি এখনো জানতে আগ্রহী। বললে খুশি হই।’ যদিও সে নিজেই প্রসঙ্গটা তুলেছে, তবু নিশ্চিত হতে পারছিলাম না সে বলবে কি না। আমি ইরানিদের জীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলাম। জানতাম যে তেহরানে অনেকেই বিয়ের বন্ধনে জড়াতে চায় না। অনেকে চিরকুমার থেকে যায়। কেউ কেউ অবশ্যি লিভ টুগেদার করে। মোল্লাদের দেশে লিভ টুগেদার? আশ্চর্য বটে, তবে দেশটির রাজধানীতে এ রকম জুটি দুর্লভ নয়। এবং মনে হলো সমাজ সেটা নিয়ে তীব্র কোনো আপত্তি তোলে না। এসব কারণে আমি উৎসুক ছিলাম। কাজেই আলীকে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করতাম সে কেন বিয়ে করেনি, প্রতিবারই সে এড়িয়ে যেত, কোনো কারণ বলত না। মনে হচ্ছে আজ সে নিজেকে খুলে ধরবে, কিন্তু পুরো আস্থা পাচ্ছিলাম না। তাই আমার তুণে থাকা শেষ তীরটা ছুড়লাম, ‘বিশেষ করে তোমার একা থেকে যাওয়ার ব্যাপারটা যদি বলো, এটা হবে আমার প্রতি তোমার বিদায়ী উপহার।’
‘আজকে সেটাই বলব, স্যার।’ আলী মøান হাসল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলতে শুরু করল না। তাকে আবার অন্যমনস্ক দেখাল, যেন একটা কাছিম গলা একটু বাড়িয়ে আবার নিজস্ব খোলে ডুব দিয়েছে। আমি চুপচাপই থাকলাম; এর আগে বহুদিন বলেকয়েও বের করে আনতে পারিনি, চাপাচাপি করলে আজকের সম্ভাবনাটাও নষ্ট হতে পারে। অপেক্ষা করাটাই ভালো হবে মনে হলো। কিছুক্ষণ পর বাটির দিকে তাকিয়েই বলল, ‘তখন আমি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি। একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল। আমরা বিয়ে করব, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু ও চলে গেল। ও শুধু না, ওদের গোটা পরিবারটাই ইউএসএ চলে গেল।’
‘কেন?’
‘উপায় ছিল না। ওরা রেজা শাহ্র সমর্থক ছিল, ইরানে থাকলে জেল-জরিমানা কিংবা আরও ভয়ানক ক্ষতি হতে পারত।’
এ এক চিরকালীন সমস্যা। যত আইন-কানুনের কথাই বলি না কেন, বিচার ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত দুর্বলের বিপক্ষেই যায়। ইরান থেকে অনেকেই ইউরোপ-আমেরিকা চলে গেছে, এখনো যাচ্ছে। তবে এদের সবারই আবেগের জায়গা ইরান। আলীর যে যোগ্যতা তাতে সেও সহজেই চলে যেতে পারত।
‘তুমি গেলেই পারতে।’
‘এই স্বর্গ ছেড়ে কোথায় যাবো স্যার? আপনি যে ইরানকে পেয়েছেন তা তিন যুগের স্যাংশন-পীড়িত ইরান। না হলে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায়? তা ছাড়া বাড়িতে বুড়ো মা একা, তাকে ফেলে গেলে কে দেখবে? উনিও শেষ জীবনটা এখানেই কাটাতে চান।’
‘বিয়ে করে নিলে পারতে,’ আমি বললাম।
‘সেটা পারতাম। কিন্তু তার কোনো অর্থ হতো না। আমার আর কোনো স্বপ্ন নেই, জীবনের কাছে কিছু চাওয়ার নেই, পাওয়ারও নেই।’
তার গলা কাঁপনহীন, সদ্য তৈরি বাসার টাইলসের মতো সমতল, কিন্তু মনে হলো চোখের কোণটা ভিজে উঠেছে। আমি অপেক্ষা করলাম। আলী পকেট থেকে রুমাল বের করল, চোখের কোণ মুছল, তারপর রুমালটা নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে আবার পকেটে ঢুকাল। তারপর সামনে থেকে স্যুপের শূন্য বাটিটা তুলে নিয়ে সেটাকে উল্টে রাখল। বলল, ‘বলতে পারেন, আমার জীবনটা স্যার, অনেকটা এই বাটির মতো।’
একটা নীরব হাহাকারের ধাক্কা আমার জিভকে অসার করে দিল। আলীও আর তেমন কিছু বলল না বা বলতে পারল না।। আমরা নীরবে ডিনার করতে থাকলাম। খাওয়া শেষে ‘ভালো থাকবেন’, ‘ইরানে আবার আসবেন’ জাতীয় দুয়েকটা বাক্য বাদ দিলে, বলা যেতে পারে, আমরা নই, বরং দুটি পাথরের মূর্তি পরস্পরকে বিদায় দিল। আলী চলে গেলেও, ‘অনেকটা এই বাটির মতো’ শব্দ কয়টা আমার মাথায় টানা গরগর করতে থাকল। হঠাৎ মনে পড়ল, ‘জানুস’ গল্পটা পড়েছি। সে গল্পটাও শেষ হয়েছে বাটির কথা দিয়েই। মনে হলো, আলীও বুঝি বা উল্টিয়ে রাখা একটা বাটি, চারপাশে শক্ত দেয়াল কিন্তু মাঝখানে এক নীরব, নিখাদ ও নিরেট শূন্যতা।