গণতন্ত্র মানে, জনগণের শাসন এবং ক্ষমতা। তখন রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে কেবল সংবিধানের অধীন এবং এই সংবিধান অনুযায়ী।’ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্দিষ্ট সময় পর প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং এই প্রতিনিধিরা জনগণের ক্ষমতার ধারক হয়ে, শাসনকার্য পরিচালনা করেন। গণতান্ত্রিক শাসনে আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ আলাদা এবং সব বিভাগই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে কাজ করে। গণতন্ত্র জনগণের মতামত, অধিকার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর ভিত্তি হলো ক্ষমতায়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও মানবাধিকার সংরক্ষণ। মৌলিক চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান না হলে, গণতন্ত্র অর্থবহ হয় না। সমস্ত শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। গণতান্ত্রিক শাসনে সরকারের বৈধতা নির্ভর করে, জনগণের ভোটের ওপর। জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত ও পরিবর্তিত হয়। তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে, তারাই ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিবর্তন করে। এটা গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও নিয়ম। ভোটাধিকার মৌলিক অধিকার, যা গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং রাজনৈতিক উন্নতির সূচক।
বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে ভোটাধিকার সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করে, এটি মানুষের স্বাধীনতার পরিচায়ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতে বহুবার বলেছেন ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জাতি, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা এমন এক নিরাপদ, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ, যা রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের রাষ্ট্র মেরামতের ভিত্তি হবে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের প্রতিটি মূলনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’ প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় সংকল্প বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রতিফলিত হোক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে এবং বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে তার স্থান প্রতিষ্ঠিত করবে। জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে। সে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করবে না। সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখবে। এই যে সমান দৃষ্টিতে দেখা, এটাই নিয়ম, এটাই আইন। এই নিয়ম বা আইন মানুষই তৈরি করেছে।
দেশ বা রাষ্ট্র পরিচালনার যত নিয়মকানুন ও আইন, সবই মানুষের সৃষ্টি এবং মানুষের কল্যাণের জন্য। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আইন অনুযায়ী, শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবেন এটাই আইনের শাসন। এ জন্যই জনগণ তাদের নির্বাচিত করেছে। আইনের শাসন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের ভিত, যা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। যখন আইনের শাসন থাকে, তখন সমাজে শান্তি ও সুরক্ষা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক সময় আইনের শাসন ঠিকভাবে ছিল না, যে কারণে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আসলে, বর্তমান পৃথিবীতে এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, কে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সেখানে ইনসাফ এবং আইনের শাসন কতটা কার্যকর। যখন আইনের শাসন থাকে, তখন অপরাধীরা রেহাই পায় না। উদাহরণ হিসেবে, আমাদের দেশে যখন আইনের শাসন ছিল না, তখন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকেও অবিচারের শিকার হতে হয়েছিল। সেই সময় আদালত ও আয়নাঘরের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। যারা শক্তিশালী ছিল, তারা আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার করত। আইনের শাসন থাকলে, সবাই নিজেদের অধিকার পাবে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে।’ আইনের শাসনকে ‘সুশাসন’ বলা হয়। সুশাসন এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যা জনগণের কল্যাণ এবং সমাজের উন্নতির জন্য আইনের শাসন, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে চলে। এখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সুশাসনের অধীনে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছ এবং জনস্বার্থে দায়বদ্ধ থাকে। অর্থাৎ সমাজে সব মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার রয়েছে। এতে কোনো ধরনের বৈষম্য বা পক্ষপাতিত্ব স্থান পায় না এবং সব শ্রেণির মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। সুশাসন নিশ্চিত হলে সমাজে শান্তি, সমতা, উন্নতি এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সামগ্রিকভাবে একটি সুখী-সমৃদ্ধ, ন্যায্য এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। যদি কেউ আইন না মানে বা নিয়ম ভাঙে, তাহলে তার বিচার হবে। কে বিচার করবে? আদালত করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আগের সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার অনুমতি ছাড়া কিছুই হতো না। মন্ত্রীরা তার নির্দেশের পুতুল হয়ে কাজ করতেন। এটা ছিল স্বৈরাচারী শাসন, যেখানে জনগণের কল্যাণের কথা ভাবা হয়নি। একজন নেতা বা সরকারের কাছে একক ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রে তিনটি বিভাগের কাজ আলাদা হওয়া প্রয়োজন নির্বাহী, আইন এবং বিচার। এগুলো একে অপরের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। তবে, শাসনব্যবস্থা যদি ভালোভাবে কাজ না করে, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।’
বিচার বিভাগ হবে সেই জায়গা, যেখানে বিচারকরা ন্যায়বিচার দেবেন। কিন্তু আগে, বিচারকরা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আইনের শাসনের মূলনীতি হচ্ছে, বিচার না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নন। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া, প্রচার নিষিদ্ধ করা কিংবা সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করা এসবই আইনের শাসনের বিরুদ্ধে যায়। এটি শুধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যখন জনগণ নিয়ম না মানে, তখন শাস্তি হয়। তাহলে সরকারি কর্মচারী যদি আইন না মানে, তাদের শাস্তি হবে না কেন? যদি তাদের শাস্তি না হয়, তাহলে আইনের শাসন থাকে না। আইনের শাসন সবার জন্য সমান। আইন না মানলে, তাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের অধিকাংশ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। আমাদের দেশে নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ বলে, সরকারি অফিসে তদবির না করলে কাজ হয় না, মামুর জোর না থাকলে চাকরি হয় না। দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা থাকে, তাহলে সেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। যদিও সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু এগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণ হলো, রাজনৈতিক নেতাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজস্ব স্বার্থের ভাবনা। এ ধরনের মনোভাব দূর করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইন-নীতিমালা পরিবর্তন করে এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে হবে।’
জনগণের চাহিদা অনুযায়ী, সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা জরুরি। জনগণ চায় সংসদ হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক। যেখানে সব সদস্য, সরকারি ও বিরোধী দল, দেশের স্বার্থে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করবে। সংসদকে জনগণের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, সরকারের কার্যাবলি এবং বিরোধী দলের সমালোচনা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলা বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন এবং জানান, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার বিষয়ে কোনো বিরোধ থাকার প্রশ্নই নেই।’ বিরোধী দলের প্রসঙ্গে বলেন, ‘শুধু বিরোধিতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে অংশগ্রহণ, যুক্তিবাদী তর্ক ও সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।’ এই সংসদের প্রধান লক্ষ্য উচিত একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন। অর্থনৈতিক সম্পদ এবং সুযোগের সুষম বণ্টন। এখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণের দিকে মনোনিবেশ করা হয়। সুশাসন ও সুষম উন্নয়নের সমন্বয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে সার্বিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা, সবার জন্য সমান সুযোগ-অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক