জ্বালানি তেলের ওপর থেকে সরকারি রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। কোনো কোনো পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না আবার কোথাও মিলছে সীমিত। ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়মিত হলে দুয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন পাম্পমালিকরা। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ৯ নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
এদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিপণিবিতান ও ব্যবসায়ী স্থাপনায় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখাসহ তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং প্রত্যাহার : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় দেশেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। আতঙ্কে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে জ্বালানি তেল কেনা শুরু হয়। এটি ঠেকাতে তেল কেনায় সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমানো হয়। সেখানে দীর্ঘ লাইন কমছে না।
তাই ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি ঠেকাতে ও সেচের ডিজেলের চাহিদা পূরণে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, আজ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে কোনো রেশনিং থাকছে না। সবাই চাহিদামতো তেল কিনতে পারবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানির সংকট যাতে না হয়, তাই আমদানি বাড়াতে বন্ধুরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এর আগে অস্বাভাবিক বিক্রি ঠেকাতে ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমা বেঁধে দেয় সরকার। ১০ মার্চ রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের জন্য সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়। শুরুতে ২ লিটারের সীমা থাকলেও এটি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ লিটার করা হয়। এ ছাড়া ৭ মার্চ থেকে ফিলিং স্টেশনে চাহিদার চেয়ে ২৫ শতাংশ হারে কম সরবরাহ করা হচ্ছিল। ১১ মার্চ থেকে বিভাগীয় শহরের ফিলিং স্টেশনে ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানো হয়। এরপর চাহিদামতো সরবরাহ পেতে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানান স্টেশনমালিকরা। খুলনায় গত শনিবার ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখেন তারা। চাহিদামতো না পেলে রাজশাহীতেও তেল না তোলার হুমকি দেন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। জ্বালানি তেল আমদানির সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, এ মাসে জ্বালানি তেল নিয়ে ১৮টি জাহাজ আসার কথা। গতকাল (১৪ মার্চ) পর্যন্ত ছয়টি জাহাজ এসেছে। ২৭ মার্চ পর্যন্ত আরও ছয়টি জাহাজ আসার সময়সূচি পাওয়া গেছে। এর বাইরে ছয়টি জাহাজের এখন পর্যন্ত সময়সূচি পাওয়া যায়নি। প্রতিটি জাহাজে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন তেল থাকে। এসব জাহাজ মূলত ডিজেল নিয়ে আসছে। শুধু শেষ দুটি জাহাজে ডিজেলের সঙ্গে জেট ফুয়েল থাকবে। ১৭ বা ১৮ মার্চে একটি জাহাজ ফার্নেস তেল নিয়ে আসার কথা। এর বাইরে খোলাবাজার থেকে অকটেনের একটি জাহাজ কেনার চেষ্টা চলছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা সূচিতে আছে। সেটি এগিয়ে এ মাসে আনার আলোচনা চলছে।
জ্বালানি তেলের মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি হয়। এর মধ্যে পেট্রোল শতভাগ দেশে উৎপাদন করা হয়। অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়, বাকিটা আমদানি করা হয়। তাই চিন্তা মূলত ডিজেল নিয়ে। বছরে বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেল।
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ টন ডিজেল মজুদ আছে। এর বাইরে আরও প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল আছে, যা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে নতুন জাহাজ যুক্ত হতে থাকবে। অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ আছে ১৬ হাজার টন করে। দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টন করে পেট্রোল ও অকটেন যুক্ত হচ্ছে। দিনে পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন। সরবরাহ বাড়ানো হলেও মার্চে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না। তবে কেউ চাহিদার চেয়ে বাড়তি তেল কিনে মজুদ করতে থাকলে চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি (ডিজেল, অকটেন) কেনার চুক্তি করা আছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধন করতে সংকটে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী মে মাসে তারা চুক্তি অনুসারে তেল সরবরাহে ব্যর্থ হতে পারে। তাই সরকারি পর্যায়ে (জি টু জি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বা সরাসরি প্রক্রিয়ায়) তেল কেনার চিন্তা করা হচ্ছে। চুক্তির চেয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ চেয়ে ইতিমধ্যে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তবুও তেল নিয়ে ভোগান্তি : সরকারের ওই ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং গ্রাহকদের চরম অসন্তোষ। সরকার ঈদযাত্রায় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘœ করতে রেশনিং বন্ধের ঘোষণা দিলেও পাম্পগুলো এখনো আগের মতোই সীমিত আকারে তেল দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় বসিলা এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বাইক নিয়ে গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর যাব। সেজন্য তেল নিতে এসেছি। কয়েকটা পাম্প ঘুরে কোথাও তেল না পেয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি। দেখি শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায় কি না।’
প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মাহফুজের সামনে তখনো কয়েকশ বাইকের লম্বা লাইন দেখা যায়, যারা অপেক্ষা করছিলেন জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য। বাইকগুলোর পাশেই দেখা যায় প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি।
ওই ফিলিং স্টেশনের উল্টো পাশে তালুকদার ফিলিং স্টেশন। যেখানে গত কয়েক দিন দিনের প্রায় সবসময় তেল নিতে আসা মানুষের জটলা থাকত, সেটি তখন বন্ধ ছিল।
রাজধানীর রাজারবাগ এলাকার রহমান ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায় মোটরসাইকেল চালকদের উপচেপড়া ভিড়। সেখানে আসা গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাচ্ছেন না।
পাম্পের কর্মীরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন, ২০০ টাকার বেশি পেট্রোল কাউকে দেওয়া হবে না। এমনকি ভাঙতি টাকা না থাকলেও গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।
একজন পাম্পকর্মী দাবি করেন, সরকার ডিপো পর্যায়ে রেশনিং বন্ধের কথা বললেও পাম্পে এখনো পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ডিপো থেকে তেল কম পাওয়ায় তারা গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
মুগদার বাসিন্দা বদরুল আলম এসেছেন রহমান ট্রেডার্সে তেল নিতে। তিনি বলেন, ‘আমি মুগদা পাম্পে গিয়েছিলাম। ওরা বলল, সন্ধ্যার পর থেকে চাহিদামতো তেল দেবে। এখন তেলই দিচ্ছে না।’
মগবাজারের বাসিন্দা ছলিম উল্লাহ বলেন, ‘এই পাম্পে কোনো ডিসিপ্লিন নেই। পাম্পের কর্মচারীরা ম্যাজিস্ট্রেটের মতো ব্যবহার করে। কথায় কথায় ধমক মারে। দেহেন না, মাইকিং করতাসে। বাইকে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হবে না। ভাঙতি না থাকলে তেল দেবে না তারা।’
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, আশা করছি আগামীকাল (আজ) সন্ধ্যার মধ্যে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি থাকবে না। ইতিমধ্যে অনেক পাম্পে তেল পৌঁছে গেছে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে।
বন্ধ থাকবে দোকানপাটের বাইরের আলোকসজ্জা : জ্বালানি সাশ্রয়ে থেকে দেশের বিপণিবিতানসহ দোকানপাটের বাইরের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কয়েকটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে রাজি হন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের সব বিপণিবিতান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখতে হবে। এসব স্থাপনায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামানো যাবে না। কোনো দোকান বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই সাইনবোর্ডের আলো বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে তারা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করবেন। বৈঠকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি, বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি, ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সাম্প্রতিককালে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।
সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসকদের ৯ নির্দেশনা : নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিদিন ডিপোর মজুদ যাচাই, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদদারদের রোধ, অতিরিক্ত দাম নিলে শাস্তি নিশ্চিত করাসহ জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ৯টি নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
গতকাল জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এসব নির্দেশনা দেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও সব জেলা প্রশাসক অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
ডিসিদের দেওয়া অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সব কাস্টমারের (পেট্রোল পাম্প ডিলার, এজেন্সি ডিলার, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ও ডিরেক্ট কাস্টমার) সরবরাহ ও বিতরণ তদারকি করা; পেট্রোল পাম্প বন্ধ হলে, কেন পাম্প বন্ধ তার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান ও ডিপোর সঙ্গে তেল সরবরাহের হিসাব ডাবল চেক করা এবং জ্বালানি তেলের পাচার বন্ধ করা।
