ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে অফিস শেষ করে অনেকেই তাড়াহুড়ো করে বাড়ির পথ ধরেছেন। কেউ বাসস্ট্যান্ড, কেউ রেলওয়ে স্টেশন, কেউবা আবার ছুটে গেছেন লঞ্চ টার্মিনালে। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগে ছুটি নিয়েও ঈদযাত্রা শুরু করেছেন অনেকেই। গতকাল সোমবার শেষ কর্মদিবসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়ি ফেরার বাড়তি তাড়া লক্ষ করা গেছে।
ট্রেনগুলো সময়মতো ছেড়ে গেলেও দাঁড়ানো যাত্রীর সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনের বেলা সড়ক পথে তেমন যানজট না থাকলেও বিকেল এবং সন্ধ্যার পর বিভিন্ন জায়গায় যানজট দেখা গেছে। মহাখালী টার্মিনাল ঘুরে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কোনো নজির পাননি বলে জানিয়েছেন সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে শেষ কার্যদিবস গত দুদিনের তুলনায় গতকাল রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের বাড়তি চাপ দেখা গেছে। ঈদে বাড়ি যেতে অনেককেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বা বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এদিন ট্রেনগুলোতে স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রীও বেড়েছে। শেষ কর্মদিবসে সড়কের যানজট থেকে রেহাই পেতে অনেকেই স্টেশনে চলে এসেছেন। রাজশাহীগামী সিল্ক সিটি এক্সপ্রেসে উঠতে অনেক যাত্রীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
রাজশাহী যাওয়ার জন্য স্টেশনে এসেছেন শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মচারী আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিলাম। তাই স্যারও মানা করেননি।’
নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের কোনো নজির পাওয়া যায়নি : সড়কমন্ত্রী
গতকাল রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, গত সাত দিনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের কোনো নজির পাওয়া যায়নি। বরং কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। মনিটরিং টিম গ্যারেজে গিয়েও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়টি তদারকি করছে এবং হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রী পরিবহনে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সড়ক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। গত সাত দিনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের কোনো নজির পাওয়া যায়নি।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী জানান, ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করেছি। সেখানে যাত্রীদের টিকিট কেটে শৃঙ্খলভাবে বাসে উঠতে এবং বাসগুলোকে নিয়মিতভাবে টার্মিনাল ছেড়ে যেতে দেখেছি। যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
মহাখালী বাস টার্মিনাল প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, টার্মিনালে জায়গা সীমিত থাকায় সব বাস একসঙ্গে পার্কিং করা সম্ভব হচ্ছে না। মূল সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একটি বাস ছাড়ার পর আরেকটি বাস প্রবেশ করছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
জ্বালানি সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তেলের দাম বাড়ানো হবে না। কোনো পরিবহন মালিক তেল না পাওয়ার অভিযোগ করলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেতুমন্ত্রী বলেন, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে, এতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। তারপরও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে সড়ক পথেও বাড়ির পানে ছুটে চলেছে অনেকেই। কর্মব্যস্থতাকে ছুটি দিয়ে গতকাল দুপুরের পর থেকে টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখ মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে। এতে অনেক সড়কে যানজট দেখা দেয়। রাজধানীর শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর রোড, শ্যামলী, উত্তরা, মহাখালী, বনানী, রামপুরা, বাড্ডা ও মালিবাগ এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যালগুলো দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকছে। অনেক জায়গায় সিগন্যাল ছাড়লেও ধীরগতির কারণে গাড়ি এগোতে পারছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা।
ধানমন্ডি থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী হামিমুল কবির বলেন, অফিস থেকে বের হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একই জায়গায় বসে আছি। গাড়ি খুব ধীরে এগোচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডগুলোতেও প্রচন্ড ভিড়।
গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে ঘরমুখো যাত্রীদের বেশ ভিড় দেখা গেছে। মহাখালী থেকে উত্তরা সড়কে দুপুর থেকেই তীব্র যানজটের চিত্র দেখা গেছে। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটির কারণে সোমবার থেকেই অনেক মানুষ একসঙ্গে ঢাকা ছাড়ছেন। এ কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। অনেক যাত্রী আবার বাস না পেয়ে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভর করছেন। ফলে এসব পরিবহনেও হঠাৎ ভাড়া বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালগুলোতে দুপুর থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই আগেভাগে এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
মহাখালী টার্মিনালে নেত্রকোনার আমিনুল ইসলাম বলেন, শেষ কর্মদিবসের ভিড় এড়াতে দুপুরের পর চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখি উল্টো চিত্র।
এদিকে, ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপ নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, গতকাল বিকেলের পর থেকে সড়কে চাপ বাড়তে থাকে। এ চাপ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।