যুদ্ধ শান্তি ঈদ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০ এএম

রমজানের ত্যাগ ও সংযমের মধ্য দিয়ে, বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের সীমাহীন আনন্দ ও উৎসবের দিন ঈদুল ফিতর সমাগত। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য ঈদুল ফিতর হলো পুরস্কারস্বরূপ। তাই শাওয়ালের চাঁদ আমাদের মধ্যে নিয়ে আসে খুশি ও আনন্দের ফল্গুধারা। পবিত্র ঈদুল ফিতর ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। পবিত্র রমজান মাসে নিজের দায়দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে, সমবেতভাবে ঈদের ময়দানে নামাজের মাধ্যমে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং মহান আল্লাহর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চাওয়া হয় ক্ষমাভিক্ষা। সৃষ্টির সেরা মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে, নীতি- নৈতিকতা ভুলে যায়, রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হয় তখনই শান্তি বিনষ্ট হয়।  ঈদকে সামনে রেখে সারা বিশে^ আজ কী হচ্ছে? বিশ^বাসীর একটাই চাওয়া, দেশে দেশে কখন যুদ্ধ বন্ধ হবে? শান্তির দেবদূত কখন দেখা দেবে? ইরান যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশে^ তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের মধ্যে দরিদ্রতা ও হতাশা বেড়ে চলেছে। আসন্ন পবিত্র ঈদের প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসীদের অনেকে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থানীয় অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরে অবস্থান করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য চাহিদা বেড়েছে ডেলিভারি পরিষেবার। এ কাজে যুক্ত হয়ে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক সড়ক থেকে আরেক সড়কে ছুটছেন বাংলাদেশি, পাকিস্তানি কিংবা নেপালি প্রবাসী শ্রমিকরা।

অন্যদিকে রাস্তায় থাকায় যেকোনো হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হচ্ছেন প্রবাসীরা। হামলার যেসব ভিডিও বা ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই তাদের ধারণ করা। কিন্তু এ জন্য তাদের আইনি জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। হামলার দৃশ্য ধারণ ও ইরানের প্রশংসা করায় চলতি সপ্তাহে বাহরাইন পাঁচজন পাকিস্তানি ও এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে।  একুইডেমের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কাদরির আশঙ্কা, আরও অনেক প্রবাসী শ্রমিক গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে, আরব আমিরাতে তারা কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হতে পারেন। কারণ দেশটিতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণকারীদের জেলে পাঠানোর ইতিহাস আছে। মুস্তফা কাদরি বলেন, এটা অনেকটা গাজার পরিস্থিতির মতো। সংঘাতের জায়গাগুলোতে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষরাই প্রত্যক্ষদর্শী হয়। সুতরাং তাদের নির্যাতনের শিকার হওয়া উচিত নয়। চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে প্রবাসী শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর দুর্বলতা।

অন্যদিকে রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করার প্রচেষ্টাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে ইরানও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না। বেশ কয়েকটি দেশ এই সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিল বলে জানান তারা। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছেন। এই যুদ্ধে ২০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরানের এবং হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল সরবরাহে সর্বকালের সবচেয়ে বড় ব্যাঘাত ঘটেছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অনাগ্রহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। যদিও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধে বেসামরিক লোকের হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন ঊর্ধ্বতন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি। ইরানে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যকে এক দ্রুত অবনতিশীল সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যম এক্সে ধারাবাহিক কয়েকটি পোস্টে মারফি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ যুদ্ধ এরই মধ্যে এই অঞ্চলকে সহিংসতার চক্রে ঠেলে দিয়েছে। এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি অনেক ভুল ধারণা করেছিলেন। গোটা অঞ্চলে এখন আগুন জ¦লছে। মারফি বলেন, প্রথম সংকটটি চলছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে। এটি অত্যন্ত সরু নৌপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবহন হয়। ইরান এই সমুদ্রপথটি বিঘ্নিত করার সক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিল ওয়াশিংটন। ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। তিনি ভুল ধারণা করেছিলেন। আর এখন তেলের দাম বাড়ছে। ইরানের ড্রোন, স্পিডবোট এবং সমুদ্র মাইন হরমুজের জলপথকে অনিরাপদ করে তুলেছে এবং এগুলো নির্মূল করা অসম্ভব বলেন তিনি। হরমুজের পর দ্বিতীয় সংকট হিসেবে মারফি আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সস্তা ও অস্ত্রধারী ড্রোন দিয়ে ইরান অনির্দিষ্টকাল ধরে আঞ্চলিক তেল ডিপোগুলোতে আঘাত হানতে পারে। এরই মধ্যে যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে ইসরায়েল ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের মজুদ কমে আসছে।

মারফি সতর্ক করে বলেন, এই সংঘাত ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। লেবানন ও ইরাক থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এবং সিরিয়াও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পবিত্র ঈদের প্রাক্কালে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? আমাদের মূল্যবোধ আজ কোথায়? স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একের এক ধ্বংস করে চলেছি, ক্ষমতার লোভে আমরা নিজেরাই নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি। সামাজিক ভেদাভেদ, পেশিশক্তির মহড়া থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের পরস্পরের হিংসা-মারামারি ও শত্রুতার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। পাপ-পঙ্কিলতার পথ পরিহার করতে হবে। সমাজে শান্তি বজায় রাখতে হলে নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয়, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ বাড়াতে হবে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ছাপ সারা বিশ্বে পড়েছে। শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবেই ঈদ উদযাপিত হবে না মুসলিম দেশে। ন্যায়বিচারের বিপরীতে চলছে জুলুম। যার যা প্রাপ্য তাকে তা না দিয়ে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অবিচার আর জুলুম এখন সারা বিশ্বে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। জবাবদিহিতার মানসিকতা আর পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এজন্য দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা।

ইসলাম সব সময় জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম বলেছে, আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বিনষ্টকারীকে আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে ক্ষমা করে দেয়। অবিচারের মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। জুলুম বা অত্যাচার হলো কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করা। এটা ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ, শারীরিক আক্রমণ বা সম্মানহানির মাধ্যমেও হতে পারে। ইসলামে সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করা অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। এর মাধ্যমে সত্যের জয় হয় এবং মিথ্যা ও বাতিল পরাভূত হয়। যিনি আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ পারিতোষিক। আর মাত্র দুদিন পর ঈদ। ঈদের আনন্দ আর চাঁদ দেখার উচ্ছ্বাসে মানুষের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হবে প্রত্যাশার আলো, মনকে পরিশুদ্ধ করার আনন্দ। মুসলমানদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে আনন্দের বার্তা। এই আনন্দের অধিকার ধনী-গরিব সবার। গরিবের আনন্দ নিহিত ধনীদের দানে। আল্লাহ ধনীদের সম্পদের মাঝেই গরিবের সম্পদ রেখেছেন। গরিবের আনন্দকে তাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার মাঝেই ধনীদের প্রকৃত আনন্দ। অন্যদিকে পবিত্র ঈদের প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদে বার্তাগুলো প্রবাসীদের দেশের মায়া বয়ে বেড়াবে। এবার আসি কানাডার ঈদ বিষয়ে। এখানে যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের রয়েছে, প্রতিটি স্টেটে তারা নির্বিঘ্নে ঈদ পালন করেন। নামাজের পর, সব ধর্মের মানুষ আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। আমরাও আনন্দের সঙ্গে তাদের জড়িয়ে ধরি পরম মমতায়। ইসলাম তো আমাদের এমন শিক্ষাই দিয়েছে। তবু ঈদের দিনে কল্পনায় মন চলে যায়, গ্রামের বাড়ির আঙিনায়। বাড়ির রাস্তার ধারে, গাছের ছায়ায়, বাঁশের চাঙে শুয়ে অলস দুপুর পার করার কথা মনে হবে। যেখানে নেই কোনো তাড়াহুড়া, যেখানে জীবন চলেছে দুপুরের অলস বাতাসের গতিতে এলোমেলোভাবে। শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পবিত্রতম ঈদ ধৈর্য এবং শুকরিয়া জ্ঞাপনের অপূর্ব সমন্বয়ে অশান্তির বিপরীতে শান্তি, হিংসার বিপরীতে সম্প্রীতি আর অনৈক্যের বিপরীতে ঐক্যের বাণী দিয়ে বিশ্বকে আনন্দময় করে তুলুক। ঈদ মোবারক।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত