মানবতা ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল বার্তা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০১:১৪ এএম

এক মাস রোজা পালন শেষে ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য বয়ে আনে আনন্দের শুভ বার্তা। ঈদ কেবল উৎসবের নাম নয়, এটি মানবিকতা ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল বার্তা বহন করে। সদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর নির্দেশনা এই উৎসবকে দিয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। তাই ঈদুল ফিতর শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম সমাজে ঐক্য, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলার এক মহিমান্বিত দিন।

ঈদ শব্দটি ‘আওদ’ শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা, বারবার আসা। আর ফিতর শব্দের অর্থ ফাটল, ভেঙে ফেলা, বিদীর্ণ করা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে ফেলা তথা রোজা রাখা ছেড়ে দেওয়া হয় বলে এ দিনটির নাম ঈদুল ফিতর।

হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, প্রতি বছর মুশরিকদের জন্য দুটি দিন ছিল, সেদিন তারা আনন্দ-উৎসব করত। রাসুল (সা.) যখন মদিনায় আসেন তখন তিনি বলেন, তোমাদের ওই দুটি উৎসবের চেয়ে আরও উত্তম দুটি আনন্দের দিন দেওয়া হলো। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। (সুনানে আবু দাউদ)

ঈদের দিন একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন। হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘যুবাইর ইবনে নফি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.)-এর সময় সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।’ অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন। (ফাতহুল বারি শরহু সহিহিল বুখারি ৬/২৩৯)

ঈদ আনন্দ-উৎসবের দিন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এ দিনটিতে তোমরা রোজা রেখো না। এদিন তোমাদের জন্য আনন্দ-উৎসবের দিন। খাওয়া, পান করা আর পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে আনন্দ-উৎসব করার দিন। আল্লাহকে স্মরণ করার দিন। (মুসনাদ আহমাদ)

ঈদুল ফিতর উদযাপনে ‘আল্লাহু আকবার’-এর চেতনা ও মর্মবাণীকে প্রকাশ করার দিন। সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিন ঈদের রাতে ও ঈদের সকালে তাকবির পাঠ করতেন। ঈদগাহে যাওয়ার সময়ও নিম্ন স্বরে তাকবির বলতেন। ঈদের নামাজের অতিরিক্ত তাকবির এবং ঈদের খুতবার তাকবিরগুলো ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

ঈদুল ফিতর উপহার দিবসের দিন : ঈদের নামাজের অশেষ ফজিলত ও সম্মানজনক মর্যাদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা রাস্তার মুখে মুখে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, হে মুসলিম! নেককাজের ক্ষমতাদাতা ও সওয়াবের আধিক্যদাতা আল্লাহর কাছে অতি শিগগির চলো। তোমাদের রাতে ইবাদত করার হুকুম করা হয়েছিল, তোমরা তা করেছ, দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা পালন করেছ। তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তাকে খাইয়েছ (অর্থাৎ গরিব-দুঃখীদের আহার দিয়েছ) আজ তার পুরস্কার গ্রহণ করো। অতঃপর মুসলমানরা যখন ঈদের নামাজ পড়ে তখন একজন ফেরেশতা ঘোষণা করেন, তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন তোমরা তোমাদের পুণ্যময় দেহ-মন নিয়ে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করো। এ দিনটি পুরস্কারের দিন, আকাশে এই দিবসের নাম উপহার দিবস নামে নামকরণ করা হয়েছে।’ (তাবারানি)

ঈদ ও কেনাকাটা : ঈদকে সামনে রেখে যে শপিং সংস্কৃতি সমাজে চালু রয়েছে, বিশেষ করে রমজানের শেষ দিকে এর চাপ আরও বেড়ে যায়। অথচ যেখানে শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে বলা হয়েছে এবং রাসুল (সা.) তখন কোমর বেঁধে ইবাদতে মশগুল হতেন, পরিবারের লোকদের উৎসাহিত করতেন। ঈদ হলো আল্লাহর নিকট সমর্পিত হওয়ার আনন্দ। মাগফিরাত লাভের আনন্দ। এই ঈদ উদযাপন করা যেমন আল্লাহর হুকুম তেমনই এর উদযাপনও হতে হবে আল্লাহর নির্দেশে। তাই ঈদ শপিংয়েই ব্যস্ত না থেকে নিজের দ্বীন-ইমানের প্রতি মনোযোগী হওয়া সচেতন মুমিনের পরিচয়। এজন্য রমজানের পূর্বেই ঈদের কেনাকাটা করে রাখা যেতে পারে।

ঈদ ও আমাদের সংস্কৃতি : আমাদের জীবনে ঈদ এমনভাবে জড়িয়ে আছে, ঈদকে বাদ দিয়ে মুসলিম সংস্কৃতি চিন্তা করা যায় না। আমাদের ছোটবেলায় ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়া, মেলা দেখা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছিল অপূর্ব আনন্দের! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে আরও নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঈদের মূল উৎস বিলীন হয়ে যায়। কৃত্রিমতায় ঢাকা পড়ে। ঈদ সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পারস্পরিক সৌহার্দ ও মানবাধিকতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, যা আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম দিক।

যানজট, ভিড়, দুর্ঘটনা সবকিছুকে উপেক্ষা করে প্রিয়জনের মাঝে ঈদ উদযাপন যেন আমাদের ঈদ সংস্কৃতির আরও একদিক। শত বাধা পেরিয়ে আপনজনের হাসি ফোটাতে পারা ঈদ আমাদের জীবনে মহান আল্লাহ পাকের এক উপহার। যে উপহার সঠিকভাবে উদযাপন করতে পারলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় মিলবে শান্তি। তাই তো ঈদ শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে আসে বারবার।

রোজা ও ঈদুল ফিতর : কিয়ামুল লাইল দিয়ে রমজানের রোজা পালন উদ্বোধন হয়। আর ঈদের নামাজের মধ্য দিয়ে এক মাস সিয়াম সাধনা শেষ হয়। কি অপূর্ব আধ্যাত্মিক সাধনা! যা কি না শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত। যে মুসলমান এক মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে আল্লাহভীরু বা তাকওয়ার নীতি অনুসরণ করতে পারবে, সেই পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করতে সক্ষম হবে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও প্রবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত