পোশাকের দাম-মানে প্রতারণা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

নিবিড় ফ্যাশন, রাজস্থান, ইরানি বোরকা হাউজ, অ্যাঞ্জেলিক, সানমার ওশান সিটি, ভিন্টেজ ওয়ার্ল্ড ঈদ কেনাকাটায় এমন পোশাক ব্র্যান্ডে আস্থা রাখেন সাধারণ ক্রেতারা। সেই আস্থাকে পুঁজি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে নামিদামি ব্র্যান্ড হাউজ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ব্র্যান্ড হাউজ পুরনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়াচ্ছে, কেউ অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে বিক্রি করছে; ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাক বলে বিক্রি করছে দেশীয় পোশাক।

ক্রেতা ও ভোক্তা অধিকারের অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ‘পোশাক কত দামে কেনা, কোথায় তৈরি, আমদানি করা কি না এসব বিষয় যাচাই করার সুযোগ থাকে না ক্রেতাদের। তাই তারা ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা রাখতে চান। আবার অনেকে তাড়াহুড়া করে কেনাকাটা সারেন। আর এটাকেই পুঁজি করে নিয়মিত প্রতারণার আশ্রয়ে বাড়তি অর্থ আদায় করে যাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।’ ভোক্তার কর্মকর্তারা বলছেন, ‘লোকবল কম হলেও নিয়মিত অভিযান চলছে। জরিমানাও করা হচ্ছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, অভিযানে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও অধিকাংশই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।’

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন সাদরুল হাসান। এই ব্যাংক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়তি দাম দিয়ে হলেও ব্র্যান্ডের দোকানগুলো থেকে পোশাক কিনি। কারণ ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা রাখি আমরা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোতেই প্রতারণা বেশি। সেই সঙ্গে চড়া দামও আদায় করা হচ্ছে।’ তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘অল্প কয়েকটি জায়গায় ভোক্তা অধিকার অভিযান চালায়। কয়েকজন মাত্র ধরা পড়ছে। বড় অংশ অভিযানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।’ যেসব দোকানে প্রতারণা ধরা পড়ে সেসব দোকান বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

অভিযানে চালালেই ধরা পড়ছে প্রতারণা : রোজা শুরুর পর থেকেই ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা সারা দেশে সীমিত আকারে হলেও বিভিন্ন শপিং সেন্টারগুলোয় অভিযান পরিচালনা করছে। সরকারি সংস্থাটির অভিযানে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রতারণা ধরা পড়ছে; জরিমানাও গুনতে হচ্ছে। গত ১৫ মার্চ রাজধানীর বনানীতে অভিযান চালায় সংস্থাটি। ওই এলাকার দুইটি জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ড নিবিড় ফ্যাশন ও জিওর্দানো ফ্যাশন। পোশাকে প্রতারণার অভিযোগে দুই প্রতিষ্ঠানকে সাত হাজার টাকা জারিমানা করা হয়। মিরপুরের অভিযানেও ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার কথা চাউড় হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অফিস থেকে পাওয়া অভিযানের তথ্যে দেখা গেছে, শুধু রাজধানী নয় সারা দেশেই চলছে ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাকে ও দামে প্রতারণা। চট্টগ্রাম নগরের টেরিবাজারে গত ৭ মার্চ অভিযান পরিচালিত হয়। সেখানে রাজস্থান নামক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ইন্ডিয়ান স্টিকার বসিয়ে প্রতারণার বিষয় ধরা পড়ে। অন্যদিকে পুরনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করছিল খাজানা নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এক দিন পর গত ৯ মার্চ নগরের আগ্রাবাদে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার। সেখানেও মেলে ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র। পোশাকের গায়ে ডাবল স্টিকার দিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছিল জেন্টেল পার্ক। পাশাপাশি অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে বিক্রি করছিল শৈল্পিক। গত ১০ মার্চ সংস্থাটির নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় ফিনলে সাউথ সিটিতে অভিযানে দেখা যায়, সেখানে বাংলাদেশি পণ্য বিদেশি বলে বিক্রি করছিল গুজেল ও ইরানি বোরকা হাউজ নামক প্রতিষ্ঠান। তারা পণ্যের ভাউচার দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি লোকাল মার্কেট থেকে অন্যের তৈরি পোশাক কিনে নিজেদের উৎপাদিত বলে বিক্রি করছিল খাদি ঘর নামক প্রতিষ্ঠান। গত ১১ মার্চ নগরীর জিইসি মোড় এলাকার সানমার ওশান সিটিতে অভিযানে দেখা যায়, বাংলাদেশি কাপড়কে পাকিস্তানি বলে বিক্রি করছিল অ্যাঞ্জেলিক নামক প্রতিষ্ঠান।

ভোক্তা অধিকারের তথ্যে দেখা গেছে, রংপুর নগরীতেও ঈদ পোশাকে চলছে প্রতারণা। বিদেশি পণ্যের নামে প্রতারণার মাধ্যমে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগে নগরীর ভিন্টেজ ওয়ার্ল্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা, রয়্যালিটি মেগামলকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া নিশাত বেনারসি শোরুমে ভারতীয় ও দেশীয় শাড়ি বিক্রি করা হলেও কোনটি বিদেশি আর কোনটি দেশি সে বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না থাকায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে টপটেন শোরুমকেও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

দিনাজপুর ও মানিকগঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে। দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে দেশি পোশাককে ভারতীয় পোশাক বলে বিক্রি চলছে। এর দায়ে ৩টি পোশাকের দোকানকে ১০ হাজার টাকা করে ৩০ হাজার টাকা জারিমানা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জেও দেশি তৈরি পোশাককে বিদেশি পণ্য বলে প্রচার করে ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এই শহরের তাজ বিপণিবিতানের ‘বণিক ফ্যাশন’কে ১০ হাজার টাকা এবং জেপি প্লাজার ‘বিভা প্লাস’কে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এদিকে গত ১০ মার্চ সিলেট নগরীর ব্র্যান্ড শপ এলাকা হিসেবে পরিচিত কুমারপাড়ার ইজি ফ্যাশনকে ২০ হাজার, ফ্রিল্যান্ডকে ২৫ হাজার, ক্লাবহাউজকে ৩০ হাজার, সি স্কাইকে ১০ হাজার, মিলানকে ১০ হাজার, বার্টনকে ৩০ হাজার ও হিদায়াহকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পূর্বজিন্দাবাজারের বারুতখানায় ‘ব্রাইটনেস’ ও ‘ওয়েস্টার্ন বয়’ নামের দুটি দোকানে দেশি কাপড় বলে কমদামের চাইনিজ পোশাক বিক্রি, আমদানির কাগজপত্র দেখাতে না পারা ও অন্যান্য অনিয়মের কারণে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফয়েজ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশি পণ্যের নামে দেশি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। আমদানি করা কাপড়ের ক্ষেত্রে এলসির কাগজ, আমদানিকারকের তথ্য, মোবাইল নম্বর সবকিছু থাকতে হবে। এর কোনোটাই দেখাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কেউ পুরনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়িয়েছেন, আবার অনেকে অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে বিক্রি করছেন। এটা ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

জনবল মাত্র ১০৮, অভিযান কম

অভিযানে নামলেই ধরা পড়ছে প্রতারণা। শপিং সেন্টারগুলোয় অভিযান খুবই নগণ্য। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ভোক্তার অধিকার। অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সংস্থাটিতে মোট জনবল ১০৮ জন। ১৮ কোটির বেশি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে জনবল খুবই সীমিত। অধিদপ্তর বলছে, কার্যক্রম পরিচালনায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ঢাকা-কেন্দ্রিক কার্যক্রমে জনবলের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত দপ্তরের অভাব; ই-কমার্স খাতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি প্রভৃতি।

জনবল সংকটের কারণে অভিযান পরিচালনা সীমিত বলে জানিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় রয়েছে পাঁচটি উপজেলা এবং ৫৪ থানা। ঢাকা নগরীর ভেতরেও অনেক শপিং সেন্টার রয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও কম লোকবলের কারণে অভিযান বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’

ঢাকায় রমজান উপলক্ষে অভিযান পরিচালনায় রয়েছে দশটি টিম। হাসানুজ্জামান বলেন, ‘প্রধান অফিস থেকে কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযান টিম বাড়ানো হয়েছে। তবু বিপুল জায়গা বাদ থেকে যাচ্ছে।’

শপিং সেন্টারগুলোতে বছর জুড়ে অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এস নাজের হোসাইন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা পুরো বছরের মুনাফা রমজান মাসে করতে চান। তাই তারা অসাধু উপায় খুঁজে নেন। কিন্তু মার্কেট বা শপিং সেন্টারগুলোর সংখ্যার তুলনায় অভিযান খুবই নগণ্য। তাই দোকানগুলোয় সারা বছর অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরগুলোতে লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত