পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ঈদের চাঁদ দেখার প্রতীক্ষা। সারা মাস সিয়াম সাধনার পর এই একফালি চাঁদই যেন আনন্দের দরজা খুলে দেয়, ঘোষণা করে‘এলো খুশির ঈদ’।
শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই আজ এক অদ্ভুত উত্তেজনা। ছাদে, মাঠে, উঠনে দাঁড়িয়ে থাকবে মানুষ; কারও হাতে দূরবীন, কেউবা খালি চোখেই খুঁজবে সরু রুপালি এক রেখা। যদি আজ চাঁদ দেখা যায়, তাহলে কালই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। এই ‘যদি’ শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের মিষ্টি অনিশ্চয়তা, যা ঈদের আগের সন্ধ্যাকে করে তোলে আরও বিশেষ। তবে কাল বা পরশু যেদিনই হোক, খুশির ঈদ একেবারেই দোরগোড়ায়।
ইতিমধ্যে ঢাকাসহ দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঈদুল ফিতরের আবহ। সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার পরপরই রেডিও-টেলিভিশনে বেজে উঠবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সেই গান, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ...।’
ইসলামের ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করা হয় সাধারণত হিজরি বর্ষপঞ্জির চান্দ্র মাসের হিসাবে। আজ ২৯ রমজান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসবে। সেই বৈঠক থেকেই ঈদ কবে তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশের আকাশে চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এদিন চাঁদ মাত্র ৫৪ সেকেন্ড দিগন্তে অবস্থান করবে। সে হিসাবে ৩০ রোজা পালিত হবে। এর ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হতে পারে আগামী শনিবার।
এদিকে সৌদি আরবে গতকাল পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে দেশটিতে ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান মাস ৩০ দিনে শেষ হচ্ছে। আর আগামীকাল শুক্রবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন সৌদিবাসী। গত রাতে এ খবর প্রকাশ করেছে খালিজ টাইমস।
অন্যদিকে ঈদ ঘিরে বাজারে শেষমুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত মানুষ। নতুন জামার গন্ধ, আতরের সুবাস, সেমাই-চিনির হিসাব-সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। দর্জির দোকানে এখনো শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে, আর শিশুদের চোখে-মুখে শুধুই আনন্দের ঝিলিক-‘কাল কি ঈদ?’ এই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় বারবার।
অন্যদিকে, ঘরে ঘরে চলছে প্রস্তুতি। রান্নাঘরে মায়ের ব্যস্ততা, ফ্রিজে সাজানো দুধ-সেমাই, আর তালিকা মিলিয়ে দেখা-কিছু বাদ পড়ল কি না। বড়রা হিসাব করছেন জাকাত-ফিতরার, যেন ঈদের আনন্দটা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। কারণ এই উৎসব শুধু নিজের নয়, সবার।
রোজার মাস জুড়ে সংযম, ধৈর্য আর আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা, তারই পরিণতি এই ঈদ। তাই ঈদের আনন্দ শুধু নতুন পোশাক বা সুস্বাদু খাবারে নয়, বরং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর সহমর্মিতায়।
আজ রাতের আকাশেই লুকিয়ে আছে সেই সুখবর। চাঁদ দেখা গেলে মসজিদে মসজিদে ধ্বনিত হবে তাকবির, টেলিভিশন ও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে ঈদের ঘোষণা। মুহূর্তেই বদলে যাবে চারপাশের আবহ, নীরবতা ভেঙে যাবে আনন্দধ্বনিতে।
তাই আজকের এই প্রতীক্ষা শুধু চাঁদের জন্য নয়, এটি এক মাসের সাধনার স্বীকৃতির অপেক্ষা, একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তুতি।
চাঁদ উঠুক বা না উঠুক, হৃদয়ে ঈদের আলো তো জ্বলে উঠেছে আগেই। তবু সেই ছোট্ট চাঁদটিই যেন সব আনন্দকে পূর্ণতা দেয়। হয়তো আজই দেখা যাবে তাকে। আর যদি দেখা যায়তাহলে কালই ঈদ।
ঈদ উপলক্ষে পরিবারগুলোতে সাধ্যমতো ভালো খাবার রান্নার চেষ্টা করা হবে। শিশুরা নতুন পোশাক পরে হৈ হুল্লোড় করবে, বেড়াতে যাবে নিকটাত্মীয়দের বাড়িতে। ঈদের দিন ঘুম থেকে উঠে গোসল-অজু করে দিনের শুরুতে সেমাই, মিষ্টিমুখ করে মুসল্লিরা যাত্রা শুরু করবেন ঈদের জামাতে অংশ নিতে। নামাজ আদায় শেষে ঈদগাহ ময়দানে বুকে বুক মেলাবেন। নামাজ আদায় শেষ করে মুসল্লিরা যাবেন কবরস্থানে প্রিয়জনের বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করতে। কবরস্থান থেকে মুসল্লিরা বাসায় ফিরে খাবার খেয়ে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করবেন। প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠবেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।
এক মাসের সংযম, ধৈর্য আর আত্মশুদ্ধির পর আসে এই উৎসব। তাই ঈদের আনন্দ শুধু নতুন পোশাক বা সুস্বাদু খাবারে সীমাবদ্ধ নয়এটি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, ক্ষমা আর সহমর্মিতার প্রকাশ।