রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই লাল-সবুজ পতাকাটা বুকে জড়িয়ে নিলেন। ভাই ডেক্লান সুলিভানকে সঙ্গী করে সেই পতাকা জড়িয়ে ছুটে গেলেন মালদ্বীপের মালে ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উল্লাসরত হাজারো বাংলাদেশি সমর্থকের কাছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে হারিয়ে যোগ দিলেন জয়ের আনন্দে। দেশের জার্সিতে অভিষেকেই নায়ক বনে গেছেন রোনান সুলিভান। দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফরোয়ার্ডের অসাধারণ দুই গোলে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে শুভ সূচনা পেয়েছে বাংলাদেশ। রোনানের জোড়ায় পাকিস্তানকে ২-০ গোলে হারিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা সেমিফাইনালের মঞ্চে এক পা দিয়ে রাখল।
২০২৪ সালে স্বাগতিক নেপালকে ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশের যুবারা। গত বছর এই আসরটি হয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ বছরের ছেলেদের নিয়ে। সে আসরে অবশ্য ফাইনালে তাদের হারতে হয় ভারতের কাছে টাইব্রেকারে। অনূর্ধ্ব-২০ আসরের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে বাংলাদেশ দলের সঙ্গী হয়েছেন সুলিভান ব্রাদার্স। কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা সুলিভান ভাইদের নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। তাদের দুই ভাই কুইন ও কাভান বর্তমানে খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর সকার লিগে। ফিলাডেফিলা ইউনিয়নের দুই ফুটবলারের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে জড়ানো। তবে রোনান ও ডেক্লানের চোখে লাল-সবুজের স্বপ্ন। সেটা সত্যি করতেই দুই ভাই যোগ দিয়েছেন অনূর্ধ্ব-২০ দলে। রোনানের অভিষেক হলেও ডেক্লানের অপেক্ষাটা বেড়েছে। তবে বেঞ্চ থেকে ভাইকে নায়ক বনে যেতে দেখার আনন্দটা লুকিয়ে রাখেননি। ডেক্লানের মতো পুরো দলই ম্যাচের পর অনেকটা সময় রোনানকে ঘিরে করেছে জয়োল্লাস।
রোনান শো শুরুর আগে অবশ্য আক্ষেপের একাধিক গল্পের জন্ম দিয়েছেন দলের আক্রমণভাগের দুই অস্ত্র নুরুল হুদা ফয়সাল ও মোর্শেদ আলী। বলের ওপর দুই তরুণের নিয়ন্ত্রণের কথা মোটামুটি জানা। বল নিয়ে কারিকুরি, নিঁখুত পাসিং, শুটিং পাওয়ার সব কিছুতেই এ দুজন গত কয়েক বছরে বয়সভিত্তিক দলগুলোর প্রাণভ্রমরা। রোনান যোগ দেওয়ায় আক্রমণভাগ আরও শক্তিশালী হবে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। তবে নতুন সতীর্থের সঙ্গে শুরুতে বোঝাপড়াটা যেন হচ্ছিল না ফয়সাল-মোর্শেদের। রোনানকে বলের জোগানেও সেভাবে আগ্রহী হননি তারা। নিজেরাই বারবার ভীতি ছড়িয়েছেন পাকিস্তানের রক্ষণে। তৃতীয় মিনিটেই গোল পেতে পারতেন মোর্শেদ। ডান দিক দিয়ে আক্রমণে উঠেছিলেন তিনি। বক্স ছেড়ে বের হয়ে এসে মোর্শেদকে রুখতে চেয়েছিলেন পাকিস্তান কিপার কাশিফ। মোর্শেদ অবশ্য সুযোগ বুঝে ফাঁকা পোস্টে শট নিয়েছিলেন, যা হেড করে ক্লিয়ার করেন পাকিস্তান ডিফেন্ডার আব্দুল রেহমান। ম্যাচের ৪৪ মিনিটে স্বার্থপরের মতো নিজে গোল করতে গিয়ে সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন মোর্শেদ। ফয়সালের পাস পেয়ে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে যান ফর্টিস এফসির ফরোয়ার্ড। নিজে শট না নিয়ে বলটা আড়াআড়ি রোনানকে বাড়ালে গোলের সুযোগটা বাড়ত। তবে মোর্শেদ নিজেই জোরালো শট নেন, যা বাইরে নেট কাঁপায়।
বিরতি থেকে ফেরার পর অবশ্য মোর্শেদ ও ফয়সালের সঙ্গে রোনানের বোঝাপড়াটা বাড়তে থাকে। ৪৯ মিনিটে মোর্শেদের আড়াআড়ি ক্রসে তার শট সহজেই আয়ত্তে নেন কাশিফ। তবে ৫৪ মিনিটে সেই পাকিস্তান কিপারকে বোকা বানিয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে জাগিয়ে তোলেন রোনান। বক্সের প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে তার ডান পায়ের ফ্রি-কিক একটু বাঁক খেয়ে পোস্টে জড়াতেই শুরু হয় বুনো উল্লাস। দুই মিনিট পর ফয়সালের সাজানো বল নিয়ে আক্রমণে উঠে কিপারকে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি মোর্শেদ। তার আলতো টোকা কাশিফ রুখে দেন। ম্যাচের ৬০ মিনিটে অবশ্য পাকিস্তানের নাজিব উল্লাহ ব্যাক হেডে বল বাংলাদেশের জালে জড়িয়েছিলেন। তবে বল দখলে লাফিয়ে উঠে কনুই দিয়ে বাংলাদেশ কিপার ইসমাইল হোসেনের মুখে আঘাত করায় সেই গোল বাতিল হয়। এর চার মিনিট পর দলের জয় নিশ্চিত করেন রোনান। বাঁ দিক থেকে শেখ সংগ্রামের মাপা ক্রসে তার হেড কাশিফের গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে পোস্টে জড়ায়।
আগামীকাল পাকিস্তান খেলবে ভারতের বিপক্ষে। সে ম্যাচে ভারত জিতলে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হবে বাংলাদেশের। সেক্ষেত্রে ২৮ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত লড়বে বি গ্রুপের সেরার লড়াই।