ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অন্যতম কারিগর, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে পল্টন থানায় দায়ের হওয়া মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
এদিকে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় আলোচিত-সমালোচিত কর্মকর্তা ও অন্য ব্যক্তিদের নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম আলোচিত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। বিশেষ করে ২০০৭ সালে সেনাশাসিত সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিষয়ে জেরা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তারের পর ওই সময় ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, তারেক রহমানকে নির্যাতনের পেছনেও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিশেষ ভূমিকা ছিল।
পুলিশ সূত্র জানায়, মাসখানেক আগেই সিদ্ধান্ত হয়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই জন্য তার সব কর্মকা-ের ওপর নজরদারি করে পুলিশ। এরই জেরে গত রবিবার গভীর রাতে বারিধারা ডিউএইচএসের ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়িটি ডিবির অন্তত শতাধিক সদস্য ঘিরে রাখেন। গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম। ওই সময় ঘুমাচ্ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তার গ্রেপ্তার নিয়ে গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সময় কথা বলেন ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম।
রাজনীতিকদের নির্যাতনের তথ্য আসলে ব্যবস্থাডিবি প্রধান : সংবািদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, গত সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা এলাকা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ডিএমপি ও ফেনীতে ১১টি মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পল্টন থানায় দায়ের হওয়া একটি মানব পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, তাকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আইন সবার জন্যই সমান। একজন রিকশাওয়ালার বিরুদ্ধে যেমন আইন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্যও একই ধরনের আইন। এতে আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যারা অপরাধ করেছেন বা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ পেশাদারিত্ব বাহিনী। অহেতুক কাউকে হয়রানি করবে না। ‘এক-এগারোর’ পট-পরিবর্তনের পর জরুরি অবস্থার মধ্যে জেনারেল মাসুদই রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে কি না, তা জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যদি এটা পাই তদন্তে, আমরা তো অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’ অন্যায়কারী যেই হোক, ‘পার পাবে না’। তিনি বলেন, এ রকম যদি কোনো বিষয় আসে, বা এ রকম যদি কেউ থাকেন যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত যে কারও অধিকার আছে আইনের আশ্রয় নেওয়ার। এখনো যদি নেয়, আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব। যে মামলার তদন্তভার তাদের হাতে থাকে, সে মামলার বিষয়ই তারা বিবেচনায় নিয়ে থাকেন। তবে একইসঙ্গে দেশের ‘গণতান্ত্রিক ধরা অব্যাহত রাখতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে’ সব অন্যায় ও অবিচারের ‘বিচার নিশ্চিতের’ চেষ্টা তারা করেন।
রাতেই কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ : ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতে গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয়ে আনার পর তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি। সেনা-শাসিত সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মানব পাচারের বিষয়েও তাকে একাধিক প্রশ্ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, নিজাম হাজারীসহ একটি বিশাল সিন্ডিকেট শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। যদিও লোটাস কামাল ও নিজাম হাজারী দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাসখানেক ধরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সব কর্মকা- নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। পরে সরকারের হাই কমান্ড থেকে সিগন্যাল আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওয়ান-ইলেভেনের ‘কুশীলব’: পুলিশ সূত্র জানায়, মাসুদ উদ্দিন ১৯৭৫ সালের ১ মে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা দখলকালে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের প্রধান (জিওসি) ছিলেন। একই বছর তিনি মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফট্যানেন্ট জেনারেল হন। তাকে এক-এগারোর পট-পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে মনে করা হয়। ওই সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ আছে। ২০০৬ সালের শেষভাগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিক মতানৈক্যের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় আন্দোলনরত দলগুলো। ওই অবস্থায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা-হানাহানির আপাত অবসান ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জরুরি অবস্থা জারি করার মধ্যে দিয়ে। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন তিনি। বাতিল করা হয় ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন।
শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও মামলা : আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালের জুনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত সেই দায়িত্বে রাখে। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচতারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা। ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী: তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীই মূলত সবকিছু পরিচালনা করতেন। সেনাশাসনের সময় তার ইঙ্গিতে সবকিছুই হয়েছে। গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটিও পরিচালনা করতেন তিনি। ওই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও ওই সময় আটক করা হয়।
৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর : গতকাল বিকেলে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করেন।
সোনাগাজীতে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ : সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি জানান, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের খবরে উচ্ছ্বসিত সোনাগাজী উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। নেতাকর্মীরা সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করে উচ্ছ্বাস প্রকাশের পাশাপাশি আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন। একই সঙ্গে এক-এগারোর ভূমিকার জন্য তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেছেন। গতকাল দুপুরে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর বাজারে বিএনপির নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল শেষে মিষ্টি বিতরণ করেন। প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আমিরাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাজল হক সোহেল, উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আউয়াল সজিব, যুবদল নেতা হাবিব উল্যাহ, এনামুল হক শাহীন, সারোয়ার হোসেন ও নুর করিম সুমন প্রমুখ। সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জয়নাল আবদীন ভাবলু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন ‘১/১১ কুশীলব, জিয়া পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোসর, দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠনকারী, ৫ আগস্টের অপকর্মের হোতা শেষ পর্যন্ত কট আলহামদুলিল্লাহ’। তার মতো অনেক নেতাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
মাসুদ উদ্দিনকে ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপ:
রিমান্ড শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়ার পথে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ওপর ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বিকেলে ঢাকার সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালত প্রাঙ্গণে এমন ঘটনা ঘটে। মানবপাচার আইনের মামলায় গতকাল বিকেল ৫টার কিছু পরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি মাইক্রোবাসে করে সিএমএম আদালতে আনার কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে এজলাসে তোলা হয়।
শুনানি শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাজতখানার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে লিফট থেকে নিচতলায় নেমে কিছুটা হেঁটে সামনে আসার পর পেছন থেকে এক ব্যক্তি তার গায়ে ময়লা পানি ঢেলে দেন। আবার কেউ একজন ডিম ছুড়ে মারেন। এ সময় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের নিবৃত করার চেষ্টা করেও থামাতে পারেননি। এ সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর হাতসহ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা পানি দেখা যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা কড়া নিরাপত্তায় তাকে দ্রুত হাজতখানায় নিয়ে যান।
