প্রতিদিনের মতো গতকাল বুধবারও বেলা আড়াইটার দিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরবাস টার্মিনাল থেকে মাত্র ছয়জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। পথে বিভিন্ন জায়গা থেকে ওঠেন আরও অন্তত ৪০ জনের মতো যাত্রী, যাদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। কিন্তু রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে এসে থেমে যায় তাদের সেই যাত্রা। গতকাল বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটে অপেক্ষমাণ থাকা বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীসহ পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন জানালা-দরজা দিয়ে লাফিয়ে নামতে পারলেও বেশিরভাগ যাত্রীসহ বাসটি মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায় নদীতে। সবশেষ রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের চেষ্টায় বাসটি পন্টুনে তোলা হয়। রাত ১টা পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ডুবুরি দল। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল।
উদ্ধারকারী দল ও ঘাট কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুসারে, বাসটি পন্টুনের নিচে এমনভাবে আটকে পড়েছে যে, এর দরজা বা জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডুবুরি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, নদী যেখানে সবচেয়ে গভীর, ঠিক সেখানেই বাসটি পন্টুনের বিশাল লোহার কাঠামোর ভেতর পড়ে আছে। পানির প্রচণ্ড চাপ এবং পন্টুনের অবস্থানের কারণে তারা বাসের ভেতর ঢুকতে পারছিলেন না। বাসের কাচ ভাঙা বা দরজা খোলার প্রতিটি চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হয়। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করলেও স্রোত এবং পন্টুনের অবস্থানের কারণে বাসটিকে নড়াচড়া করানো যাচ্ছিল না।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, বিকেল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অন্য ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। এ সময় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না।’
উদ্ধারকাজ যখন পুরোদমে শুরু হয়, তখনই হানা দেয় প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি। এতে উদ্ধারকারী ফেরি হামজা এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের কাজ পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হয়। স্থানীয় ও স্বজনদের মধ্যে এ সময় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। নিখোঁজদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলে হয়তো প্রাণহানির সংখ্যা আরও কমানো যেত।
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গান্ধীমারা এলাকার যাত্রী আবদুল আজিজুল ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলেও তার চোখমুখে এখন শুধুই অন্ধকার। তিনি স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশ্যে বাসে উঠেছিলেন। আজিজুল ডুকরে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘আমি কোনোমতে বের হতে পারলেও আমার কলিজার টুকরাদের টেনে বের করতে পারলাম না।’
আজিজুলের মতো আরও অসংখ্য মানুষের আহাজারিতে দৌলতদিয়া ঘাটের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ঘাটে বাস থেকে নেমে যাওয়া আরেক যাত্রী জানান, বাসটিতে চালক ও সহকারীসহ ৪০-৪৫ যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পরপরই ৮-১০ যাত্রী জানালা দিয়ে বের হয়ে সাঁতরে বা স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে সক্ষম হন।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, ‘বাসটি পন্টুনের নিচে আটকা পড়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাট থেকে আরও ডুবুরি দল এসেছে। এ ছাড়া ঢাকা সদর দপ্তর থেকেও একটি বিশেষায়িত ডুবুরি টিম এসেছে।’
বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। অবশেষে রাত ১টার দিকে বাসটিকে পন্টুনের ওপরে তোলা সম্ভব হয়েছে। সবমিলিয়ে নারী ও শিশুসহ ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ডুবুরি দল। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে কাজ চলছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোন করে দ্রুতগতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। দুর্ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
