দীর্ঘ ১৮ বছর পর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হিসেবে জাতীয় প্যারেড ময়দানে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ সকাল ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী।
এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড মাঠে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সম্মান জানিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় তার সঙ্গী হিসেবে জিপে ছিলেন প্যারেড অধিনায়ক মেজর জেনারেল এসএম আসাদুল হক। বাদ্যদল ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ গানের সুর বাজাতে থাকে। প্রায় ১৫ মিনিট রাষ্ট্রপতির প্যারেড পরিদর্শনের পর অধিনায়ক আবারো ঘোড়ায় আরোহণ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে ধন্যবাদ জানান।
পরে অধিনায়ক কুচকাওয়াজ শেষ করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চেয়ে ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। অধিনায়কের নেতৃত্বে প্রতিটি দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শনের জন্য এগিয়ে আসতে থাকে।
ছন্দবদ্ধ দীপ্ত পায়ে সম্মুখে এই দৃপ্ত যাত্রা, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর তাল মিলিয়ে প্রত্যয়ী শপথের এই প্রদর্শনী চলতে থাকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে।
মার্চপাস্টের শুরুতে ছিল বিভিন্ন পতাকাবাহী তিনটি দল। এরপর পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানিয়ে এগিয়ে যায় সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাজোয়া রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি কন্টিনজেন্ট, এয়ার ডিফেন্স কন্টিনজেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারস কন্টিনজেন্ট, সিগনালস কন্টিনজেন্ট ও সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট।
এরপর জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিনজেন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান। দলটি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যালারিতে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সালাম প্রদর্শন করেন এবং অন্যান্য দর্শকরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।
পর্যায়ক্রমে প্যারাকমান্ডো কন্টিনজেন্ট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, কারা পুলিশ, সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও মডারনাইজড ইনফ্যান্ট্রি কন্টিনজেন্টগুলো সালাম প্রদর্শন করে মার্চপাস্ট সম্পন্ন করে।
সেনা ও বিজিপির ডগ স্কোয়াড এবং অশ্বারোহী কন্টিনজেন্টের পর খোলা গাড়িতে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট এগিয়ে যায়।
এ সময় ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে মূল মঞ্চের দুই পাশে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন, যারা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। পরে প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করেন। এরই মধ্যে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান।
পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার ও নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়।
পরে প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহর। সেখানে ট্যাংক, কামানের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম প্রদর্শিত হয়।
এরপর শুরু হয় কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ বিমানবাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’র মহড়া। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো বিভিন্ন ফর্মেশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শন করে।
পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রং ছড়াতে ছড়াতে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। ‘লো লেভেল’ ফ্লাইং বিমান প্রদর্শনীর পর যোগ দেয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান। এই আধুনিক যুদ্ধবিমানটি রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদর্শন করে। কয়েক দফা টার্ন পারফরম্যান্স ও লো লেভেল ফ্লাইং প্রদর্শনের পর মূল মঞ্চের পেছন দিক থেকে এসে ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শন করে মেঘের আড়ালে চলে যায় মিগ-২৯, যেটিকে ‘চূড়ান্ত প্রদর্শনী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ১১টা ৫৯ মিনিটে। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রদর্শনীতে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলান।
রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এগিয়ে এলে তার সঙ্গেও হাত মেলান রাষ্ট্রপ্রধান। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধান উপস্থিত ছিলেন। ১২টা ৬ মিনিটে প্যারেড গ্রাউন্ড ত্যাগ করে রাষ্ট্রপতির গাড়িবহর। এ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে তিনিও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও হাত মেলান।
মনোজ্ঞ এ আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে উপভোগ করেন তার কন্যা জাইমা রহমান।
২০০৮ সালের পর অর্থাৎ ১৮ বছর পরে এবার ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত হয় এ প্রদর্শনী।
গত বছর আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুচকাওয়াজ বা প্যারেড প্রদর্শনী বন্ধ ছিল। তবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপনে এ আয়োজন থাকত।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার স্বাধীনতা দিবসে জাঁকজমকভাবে এ আয়োজন করতে রোজার শুরু থেকে প্যারেড স্কয়ার মাঠে প্রস্তুতি শুরু হয়। মঙ্গলবার ‘চূড়ান্ত রিহার্সেলের’ মাধ্যমে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
