বাবার সঙ্গে দাবা খেলাটা বেশ জমে। সুযোগ পেলেই আমরা বসে যাই। মা ভীষণ বিরক্ত হয়। আজও হলো। বসার ঘরে উঁকি দিয়েই ছুড়ল বাক্যবাণ।
‘ভর সন্ধ্যায় দাবা নিয়ে বসেছ। আজ তাহলে লেখাপড়া লাটে উঠল।’
ঘোড়ার চাল দিল বাবা। তারপর চাপা গলায় আমাকে বলল, ‘দেখেছিস, লাট সাহেবরা চলে গেছে। কিন্তু লাট শব্দটা রয়ে গেছে।’
‘ফিসফিস করে ছেলেকে কী বলছ?’ মা জিজ্ঞেস করল।
‘না, তেমন কিছু না। ওকে বলছিলাম, একটু চা হলে জমে যেত।’ দাবাবোর্ড থেকে চোখ না সরিয়ে বলল বাবা।
‘সাহেবি অভ্যাসও রয়ে গেছে। সকাল-সন্ধ্যায় চা না হলে চলে না।’ মা খোঁচা দিল। মায়ের কান বরাবরই খাড়া। ফিসফিস করে বলার পরও ঠিকই শুনতে পেয়েছে।
বাবা আর কথা বাড়াল না। মা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। জানি, চা চলে আসবে একটু পরেই।
এবার আমার চাল দেওয়ার পালা। ভাবছি কী চাল দেওয়া যায়। এই সময় বেজে উঠল বাবার মোবাইল ফোন। ফোনের দিকে তাকিয়ে দুইশ পাওয়ারের বাল্বের মতো উজ্জ্বল হলো তার মুখ। কল ধরল। শ্রদ্ধা ও আনন্দ মেশানো গলায় বলল, ছোটমামা কেমন আছেন?
এরপর শুধু শোনা গেল হ্যাঁ, হুম, আচ্ছা, খুব ভালো... জাতীয় শব্দ। ফোন রাখার আগে বাবা বলল, ‘সাবধানে আসবেন ছোটমামা। আমরা আপনার অপেক্ষায় আছি।’
‘যা তোর মাকে ডেকে নিয়ে আয়।’ বাবা আমাকে বললেন। তার চোখমুখে আনন্দ খেলা করছে।
মা আসার পর জানা গেল বিস্তারিত। রাতের ট্রেনে ঢাকায় আসছেন বাবার ছোটমামা। পৌঁছাবেন কাল সকালে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিকেলে একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। আবার ফিরে যাবেন রাতের ট্রেনেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি থাকবেন আমাদের বাসায়। বাবা খুব খুশি। তাকে এত খুশি হতে অনেক দিন দেখিনি।
দাবা খেলাটা এরপর আর জমল না। চা খেতে খেতে বাবা তার ছোটমামার গল্প শোনাতে থাকল। এই প্রথম তিনি আমাদের বাসায় আসছেন। এক ফাঁকে মা জিজ্ঞেস করল, ‘কী রান্না করা যায় বলো তো? বাবা বলল, ‘পোলাও করো। ছোটমামা খুব পছন্দ করেন।’
পরদিন সকালে ডোরবেল বেজে উঠল। বাবার ছোটমামা চলে এসেছেন। তার এক হাতে ব্যাগ। আরেক হাতে দই-মিষ্টি।
আমার ধারণা ছিল ছোটমামারা অল্প বয়সের হয়। বাবার ছোটমামার তো অনেক বয়স। আশির কাছাকাছি। মাথার চুল ধবধবে সাদা। শরীর এই বয়সেও যথেষ্ট মজবুত।
আমাকে দেখেই বললেন, ‘কেমন আছো ভাই রুদ্র? আমি তোমার ছোটদাদু।’
কী আশ্চর্য! উনি আমার নাম জানেন। আমি হেসে বললাম, ‘ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’
‘হ্যাঁ। ভালো আছি।’ ছোটদাদু বললেন। সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এবার কোন ক্লাসে?’
‘ক্লাস ফোরে।’
‘ক্লাস ফোর। খুলছে পড়ার দোর।’ ছড়া কেটে বললেন ছোটদাদু। এরপর ব্যাগ থেকে বের করলেন অনেকগুলো বই। আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এগুলো তোমার জন্য।’
সবগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই। গুনে দেখি সাতটা।
‘বলো তো ভাই, আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ কতজন?’ ছোটদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
‘সাতজন।’ আমি জবাব দিলাম।
‘সবার নাম জানো?’
‘জানি।’
‘ভালো। খুব ভালো।’
বাবা ছোটদাদুকে বলল, ‘ছোটমামা, ফ্রেশ হয়ে আগে নাস্তা করে নেন। কথা পরে হবে।’
নাস্তা শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ছোটদাদু এখন বসার ঘরে। তার সঙ্গে আমি আর বাবাও আছি। এরই মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বারান্দা থেকে বেলি ফুলের সুগন্ধ আসছে।
‘বাহ্! বেলি ফুটেছে।’ ছোটদাদু বললেন।
‘হ্যাঁ, বারান্দায় টবের গাছে।’ বাবা বলল।
‘ছোটদাদু, আপনার প্রিয় ফুল কোনটা?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘লাল যে কোনো ফুল আমার প্রিয়। সবুজ পাতার মধ্যে লাল ফুল ফুটে আছে। এর চেয়ে চমৎকার দৃশ্য আর হয় না।’
গল্প ডালপালা ছড়াতে থাকল। এর মধ্যে মা জুস নিয়ে হাজির। তরমুজের জুস। ছোটদাদু বললেন, ‘এই জুস আমার খুবই প্রিয়। বৌমা, তুমি জানলে কী করে?’
‘আপনার ভাগ্নে বলেছে।’ মা বলল।
‘তরমুজ আপনার প্রিয় ফল?’ আমি প্রশ্ন করলাম।
‘হ্যাঁ। তরমুজ আমার প্রিয়।’
‘বাইরে সবুজ। ভেতরে লাল। এ কারণে প্রিয়?’
আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে ছোটদাদু বাবাকে বললেন, ‘তোমার ছেলের অনেক বুদ্ধি।’
‘ছোটমামা, আপনি এখন ও ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নেন।’ মা বলল। বাবাও সেই কথায় সায় দিল।
দেড়টা বাজে। আমরা খেতে বসেছি। মা অনেক কিছু রান্না করেছে। পোলাও, বেগুন ভাজি, আলুর চপ, চাইনিজ ভেজিটেবল, রুই মাছ ভাজি, মুরগির রোস্ট, খাসির রেজালা। শেষ পাতে টমেটোর চাটনি ও পায়েস। সঙ্গে দইয়ের শরবত। মা আমাদের তিনজনকে বিভিন্ন পদ তুলে দিচ্ছে।
‘বৌমা, আমি কিন্তু মাছ খাই না।’ দৃঢ় গলায় বললেন ছোটদাদু। তার বলার মধ্যে কী যেন একটা ছিল।
‘হ্যাঁ, ছোটমামাকে মাছ দিয়ো না। মামা মাছ খান না।’ বাবা তড়িঘড়ি বললেন।
ছোটদাদু খেলেন খুবই অল্প। তবে সব পদ খেলেন একটু করে। মায়ের রান্নার প্রশংসা করলেন।
বেলা তিনটের দিকে আয়োজকরা গাড়ি পাঠাল ছোটদাদুকে নিয়ে যেতে। ছোটদাদু চলে যেতেই বাবাকে বললাম, ‘একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘কী প্রশ্ন?’
‘ছোটদাদু মাছ খান না কেন?’
‘আগে খেতেন। একাত্তরের পর আর খান না।’ বাবা বলল।
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘মুক্তিযুদ্ধ শেষে ছোটমামা বাড়ি ফিরছিলেন। চকের বিল পার হচ্ছিলেন নৌকায়। একাত্তরে এই বিল ছিল ভয়ংকর এক জায়গা। এই বিলের পশ্চিম পাশে বিশাল বটগাছ। সন্দেহ হলেই হলো। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা এলাকার নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে আসত। এরপর বটগাছের নিচে চলত নির্যাতন। গুলি করে মেরে ফেলার পর লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো বিলে। ছোটমামা ফেরার সময় দেখলেন বিলে ভাসছে লাশ আর লাশ। লাশগুলো ফুলে উঠেছে। পচন ধরেছে। আর মাছে ঠুকরে খাচ্ছে সেগুলো। ছোটমামা এরপর থেকে আর কোনো দিন মাছ খাননি।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে বাবার গলা ধরে এলো।
আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না। মা বলল, ‘ছোটমামা মাছ খান না, তুমি আমাকে আগেই বলতে পারতে।’
‘সরি। ছোটমামা আসছেন, এই উত্তেজনায় বিষয়টা আমার একদম মনে ছিল না।’ বাবা অপরাধীর মতো বলল।
৫
