৮ কিমি এলাকায় তামাকের পরিবর্তে বোরো চাষ

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত টংকাবতী ও জামছড়ি খালের দুই পাশের কৃষি জমিতে একসময় ব্যাপক তামাক চাষ হতো। স্থানীয় কৃষকরা অতিরিক্ত লাভের আশায় বোরো চাষ না করে তামাক চাষ করত। এতে স্থানীয় কৃষি জমির মাটির গুনাগুন ও পরিবেশ বিপণœ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই তামাক চাষ বন্ধে এবং বোরোর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে স্থানীয় লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে ও বিএডিসির (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) অর্থায়নে এখানে গড়ে ওঠে ছয়টি সেচ প্রকল্প।  যে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে জামছড়ি খালের

ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকরা বোরো মৌসুমে চাষের জমিতে স্বল্প খরচে পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে। সেচ প্রকল্পে উৎসাহিত হয়ে স্থানীয় শতাধিক কৃষক চরম্বা ইউনিয়নের প্রায় ৮ কিমি এলাকার মধ্যে ১৪৫ হেক্টর কৃষি জমিতে এখন তামাক চাষের পরিবর্তে বোরো চাষ করছেন। এতে প্রায় ২০ হাজার মন ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিস।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চরম্বা ইউনিয়নের পূর্ব বাইয়ার পাড়া, বনাকাটা বিল, করিমাখোলা বিল, বড়খোলা বিল, ওয়াহিদের পাড়া, লালারখীল, মজিদের পাড়া, আতিয়ার পাড়া, নাছির মো. পাড়া, মাইজবিলা আদর্শ গ্রাম ও রাজঘাটা এলাকার কৃষকের বোরো ধানক্ষেতে কাজ করছেন। এক সময় এসব এলাকার কৃষি জমিতে ছিল তামাকের আগ্রাসন। পাশাপাশি চরম্বা ইউনিয়নে রয়েছে ২০টির অধিক ইটভাটা। তাই তামাকের চাষ ও ইটভাটার কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চরম্বা ইউনিয়নের স্থানীয় পরিবেশ।

এ ব্যাপারে স্থানীয় কৃষক নুরুল আলম ও ছালেহ আহমদ জানান, একসময় আমরা অতিরিক্ত লাভের আশায় কৃষি জমিতে তামাক চাষ করতাম। যখন সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানির সমস্যা মিটে যায় তখন থেকে তামাকের পরিবর্তে বোরো চাষ শুরু করি। তা ছাড়া আমরা কৃষি অফিস সূত্রে জানতে পারি যে, তামাক চাষের কারণে পরিবেশ দূষণ ও কৃষি জমি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও কৃষক আখতার হোসেন বলেন, বোরো চাষের জন্য ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিনে কৃষি জমিতে পানি দিতে প্রতি হেক্টরে ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন বিএডিসির অর্থায়নে সোলার প্যানেলের সাহায্যে যে সেচপ্রকল্প হয়েছে তাতে খুব কম খরচে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাচ্ছে কৃষি জমি। এখন কৃষকরা তামাক চাষ না করে বোরো ও সবজি চাষ করছে।

চরম্বা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সৈয়দ হোসেন বলেন, বিএডিসির সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে চরম্বার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পতিত জমি চাষের আওতায় আনলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি চরম্বার জামছড়ি খালে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগ।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ইউনিটের বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, যেখানে পানির কারণে কৃষি জমি অনাবাদী থাকে সেখানে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়। সেভাবে চরম্বা ইউনিয়নে পানির অভাবে কৃষি জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। তাই ছয়টি সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে প্রায় ৮ কিমি এলাকায় বোরো চাষসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ড. মো. কামাল হোসাইন বলেন, তামাকের কারণে মাটি ও পানি দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি তামাক চাষিরা একসময় নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তামাক পুড়ানো ঘরে প্রচুর বনের কাঠ পোড়ানো হয়। তা ছাড়া তামাক আগ্রাসী উদ্ভিদ। এখানে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। ফলে মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। ফলদ গাছেও উৎপাদন কমে যায়।

লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী সফিউল ইসলাম বলেন, লোহাগাড়া উপজেলায় এক সময় ২১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হতো। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ১৩ হেক্টর। চরম্বা ইউনিয়নে বিএডিসির অর্থায়নে খালের ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে কৃষকেরা বোরো চাষে উৎসাহিত হয়েছে এটা একটা বড় সাফল্য। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকছে পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত