এক এগারোর কুশীলব আলোচিত সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ভিন্ন ভিন্ন মামলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে রিমান্ডে রয়েছেন। ওয়ান ইলেভেনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নেওয়া হয়েছে মানব পাচার মামলায়। আর আয়নাঘর ও মোবাইল ফোনে আড়িপাতার কারিগর হিসেবে চিহ্নিত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে নেওয়া হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলায়। তাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন মামলা থাকলেও রিমান্ডে সাবেক এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে এক এগারোর বিষয়ই বেশি প্রশ্ন করা হচ্ছে। তবে তারা বিভিন্ন কৌশলে প্রশ্ন এড়িয়ে যান, দাম্ভিকতা দেখান, কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা করেন। সবকিছু চাকরির সুবাদে করা হয়েছে বলেও দাবি করেন।
গতকাল শুক্রবার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা ভিন্ন আর রিমান্ডের প্রশ্ন ভিন্ন হওয়ায় তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা দেখা যায়। তারা উল্টো প্রশ্ন করেন এ বিষয়ে কেন প্রশ্ন করা হচ্ছে, যে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই মামলার বিষয় প্রশ্ন করবেন। গ্রেপ্তারকৃতরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের সব ধরনের টেকনিক জানা, তাই কোনো বিষয়ে অকপটে মুখ খুলছেন না।
এর আগে বুধবার রাতে মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকা থেকে শেখ মামুন খালেদকে জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আর গত সোমবার রাতে মানব পাচার মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই বর্তমানে পুলিশি রিমান্ডে আছেন। তাদের মামলা ভিন্ন হলেও রিমান্ডের মূল অনুসন্ধানই ওয়ান ইলেভেন ইস্যু নিয়ে বলে জানা যায়। গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নানা বিষয় নিয়ে রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই আশানুরূপ তথ্য পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভোল্ট পাল্টে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারক ও জিয়া পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলার চেষ্টা করতেন। ফলে ওয়ান ইলেভেন, আয়নাঘর ও মোবাইল ফোনে আড়িপাতার মতো কারিগর হয়েও বিন্দাস জীবনযাপন করতেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতেন তারা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান কানাডায়। সেখানেও তিনি ব্যবসা শুরু করেন। মাসুদ উদ্দিন কানাডা থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান একটি স্থানীয় অস্ত্র কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য আবেদন করেন। ১১ মামলা মাথায় নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি দেশে ফেরেন। দেশে আসার পরপরই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তার পিছু নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পারিবারিকভাবে যোগাযোগ শুরু করেন।
সূত্র আরও বলেন, একইভাবে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদও গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। তিনিও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছি। এখনো জিজ্ঞাসাবাদ চলমান। তার দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে। বিগত সময়ে তাদের বিভিন্ন কর্মকা- গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে। রিমান্ডে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক এগারোর সরকার এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলের অনেক অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
