মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালের তেলেসমাতি 

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৩:০৫ এএম

এই নামের সঙ্গে স্বাধীনতা বোধ ও জুঁই ফুলের সুগন্ধি জড়িয়ে আছে। তাই যখনই দেশ রূপান্তরের শেষ পাতায় এই নিউজ সম্প্রতি যখন দেখলাম মন টানল, পড়ে দেখার। পড়ে তো চোখ ছানাবড়া। মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার হাসপাতালের অনিয়ম ও অবৈধ এবং  বেআইনি কাজ মেনে নিতে পারছিলাম না। স্বাধীনতার পর ওই ভবনটি যখন একতলা পঙ্গু মুক্তি সেনানীদের থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল, তারা সংখ্যায় ছিলেন কয়েকজন মাত্র। আজ তারা কতজন বা কারা ওই টাওয়ারের হাসপাতালগুলো চালান, তা আমি জানি না। কিন্তু জানতে পারলাম, কী অন্যায় ও অবৈধ কাজ তারা করে চলেছেন। নিউজের একটি অংশ পাঠ করলেই বোঝা যাবে, তারা কি স্বাধীনতার পক্ষের মুক্তিযোদ্ধা, নাকি দুর্বৃত্তদের সহোদর কেউ। তিন বছর আগে লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। তবুও চলছে টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ৩০ শয্যার এই হাসপাতালে ৯ জন ডাক্তার নিয়োগের বিধান থাকলেও, কোনো ডাক্তারের নিয়োগপত্র এবং কর্তব্যরত কোনো ডাক্তার পায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়; কর্তব্যরত নার্স এবং নার্সদের কোনো নিয়োগপত্র পায়নি। পায়নি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে এনআইসিইউ কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগের প্রমাণও। সম্প্রতি একদিন সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের এই হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা। এরপর নানা অসংগতি পেয়ে পরিদর্শন শেষে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের নির্দেশ দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শন টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হাসপাতালে পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন এবং নোংরা যা ভর্তি রোগীদের মধ্যে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। অপারেশন থিয়েটারের পরিবেশ অপরিষ্কার, সেটিও রোগীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। এনআইসিইউর পরিবেশ অপরিষ্কার এবং যন্ত্রপাতি অপ্রতুল যা চিকিৎসাসেবার পরিপন্থী। শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠান নয়; মুক্তিযোদ্ধা ভবনের আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে নানা অসংগতি পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সাতটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দুটি বন্ধ, দুটি আংশিক বন্ধ এবং তিনটিকে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বন্ধ করে দেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানটি হলো প্রাইম ব্লাড ব্যাংক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি অনন্য কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়ে বা আংশিক বন্ধ করে ও তাদের দুটিকে কাজ চলিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে। আবার দুটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে যে সুযোগ তারা দিয়েছে, তা যথার্থ কি না সেই বিবেচনাও জরুরি। যেসব নির্দেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিয়েছে, হাসপাতালগুলো সেই মোতাবেক কাজ করে তাদের বদনাম ও দুর্নাম ঘুচিয়ে তারা আবারও স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারবেন। আর যদি না করেন, তাহলে কি প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসাসেবা দেওয়া থেকে বিরত থাকবে? আমাদের দেশে খুব জোরেশোরে এই ধরনের কাজ শুরু হয়, কিন্তু মাস না যেতেই তা যেন আবার থমকে যায়। এই থমকে যাওয়ার পেছনে থাকে কুচক্রী মহলের হাত। তারা হয়তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী বকুল সাহেবকে বোঝাবেন যে, তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করেছেন। এখন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ টেকনিশিয়ান, ডাক্তার, নার্স প্রভৃতি নেওয়ার জন্য সময় দাবি করবেন। ফান্ডও দাবি করবেন। তাদের হাতে ফান্ড না থাকলে, তার ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তুলবেন। সে-সব পাওয়ার পর তারা চিকিৎসা দেওয়া শুরু করবেন এই নিশ্চয়তা তারা দেবেন, তাতে কোনো ভুল নেই। আর যদি যন্ত্রপাতি সচল থাকে, তাহলে দক্ষ টেকনিশিয়ানের ঘাটতি মোকাবিলার জন্য সরকারের কাছে বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ফান্ড চাইতে পারেন। এমনকি ক্লিনিক পরিচ্ছন্ন করার জন্য জনবল নিয়োগেরও ফন্দি আঁটতে পারেন তারা। আবার প্যাকেজ হিসেবে তদবির করাও তাদের মাথায় আসতে পারে। নিজেদের কাজের জন্য লজ্জিত হওয়ার বদলে তারা নানা ফন্দি-ফিকির করতে পারেন। তবে, এটা ভুলেও বলবেন না যে তারা ডিফল্টার লাইসেন্স রিনিউ না করেই ব্যবসা-সেবা দিচ্ছেন। বরং এটাই বলবেন যে, বিগত ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও হাসিনা সরকার তাদের আবেদন পাস করে দেননি। এর ফলে লাইসেন্স নবায়ন করা যায়নি। সরকার যে জগদ্দল পাথরের মতো হাঁটে, সেটা প্রমাণ করতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না।

আইডিয়া মন্দ না। সরকারের চাওয়া, রোগীরা যেন সেবা পায়। চিকিৎসকরা যেন সেবা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সত্যিকার অর্থেই পালন করেন। চিকিৎসক যদি চিকিৎসা না দিয়ে সুখী থাকেন, তাহলে তিনি ও তারা অসৎ। তারা মানব সেবায় বিশ্বাসী নন। তারা কেবল নামের মোহ ও অর্থের লোভে ব্যবহৃত হচ্ছেন। যদি কিছু মনে না করেন, আমাদের ডাকসাইটে চিকিৎসকরা তাহলে বলি, আজ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেবা নয় অর্থের মোহেই রাতদিন দৌড়াচ্ছেন এটা কি ভুল বলা হলো? যদি তা না হয়, তাহলে কেন তারা দেড় হাজার, দুই হাজার টাকা ভিজিট নিচ্ছেন? তারা সেই পরিমাণ অর্থ দিতে পারছেন বলেই কি ওই ফি-পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে? যাদের সামর্থ্য আছে তারা কি এভার কেয়ার, ইউনাইটেড বা ওই স্তরের হাসপাতালগুলোতে যাচ্ছেন। কিন্তু  সাধারণ মানুষ কি ওই সব হাসপাতালে যেতে পারেন? তারা কি ওই সব হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন? চিকিৎসাসেবা কেনার সামর্থ্য যাদের নেই, তারা কেন সুচিকিৎসার জন্য এভারকেয়ারে যেতে পারবেন না? এই যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্য, তা নিরসন হবে কেমন করে? সেই ভাবনা কি সরকারের আছে? নাকি সরকার কেবল জনসাধারণের জন্য ঢাকা মেডিকেলসহ সরকারি চিকিৎসালয় রেখেছেন? আর বিত্তবানরা যাচ্ছেন কিছু চিহ্নিত হাসপাতালে। এটা চলতে পারে না। এক দেশে, এক সংবিধানের লিখিত বয়ান সামাজিক জীবনে বৈষম্য থাকতে পারে না। সবার আগে যদি বাংলাদেশ হয়, তাহলে সবার সঙ্গে সবাই একই রকম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ দায়িত্ব সরকারের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নে একটি মৌলিক পদক্ষেপ হতে হবে। সাধারণ মানুষ যায় ঢাকা মেডিকেলে বা ওই মাপের সরকারি হাসপাতালে। আর ধনবানেরা যায় সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দিল্লি-চেন্নাই। সরকারি হাসপাতালে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ছাড়া, আর কোনো কিছু মেলে না। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনার নির্দেশ দেন চিকিৎসক নিজেই। অপারেশনের রোগীর কপালে জোটে, আরও বড় ব্যয়ের দুর্ভোগ। একটা ব্যান্ডেজের জায়গায় তারা আনান চারটা। আর লক্ষ্য করলেই দেখবেন, সরকারি হাসপাতালের চারদিকে বিভিন্ন ওষুধের দোকান। ওই সব দোকানে সব ওষুধই পাওয়া যায়। সেই ওষুষের দামও তারা অনেক বেশি নেন। এটা সবারই জানা। যেহেতু এর কোনো সমাধান সরকারি তরফ থেকে করা হয়নি বা সে রকম চেষ্টাও হয়নি, তাই চিকিৎসাপ্রার্থীরা এখন আর অভিযোগ করেন না। সরকারি হাসপাতালের পরিচালকরা যে এটা জানেন না, তা নয়। শুনেছি তারাও মাসোহারা হিসেবে অনেক কিছু পান।এবং এরাই মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালগুলোতে পরিদর্শনে যাবেন। পরিচ্ছন্ন না হলেও, লিখে দেবেন পরিচ্ছন্ন হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম মেরামত করা হয়েছে, কিংবা কেনা হয়েছে। নিয়োগ পেয়েছেন প্রয়োজনীয় ডাক্তার-নার্স ও টেকনিশিয়ান এবং তারা চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন।

যদি গোপনে আরেকটি পরিদর্শক দল ওই হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হয়, তাদেরও তারা চিনে নেবে তাদের স্বার্থে। না চিনতে পারলে, তারা যদি সৎ হন, তাহলে সত্য উঠে আসবে। আমাদের কি এখন সৎ মানুষের খোঁজে বের হতে হবে? ভেবেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সততা থাকবে। তাদের দেখে সাধারণ মানুষ শিখবে। বাস্তবে দেখলাম, মুক্তিযোদ্ধারাই দখলবাজ হয়েছেন, লুটের অংশীজন হয়েছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেননি। একজনের নামে আছে সেই দুর্নাম, যা তিনি অর্জন করেছেন। তার শিল্প গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার পর, বকেয়া টাকা পরিশোধ করেননি। আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৫০ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ায়, হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।  এ-রকম আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যারা জনগণের অর্থ, সম্পদ মেরে দিয়েছেন সিম্পলি গায়ের জোরে। এই মাস্তানি শিল্প এতটাই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে যে,  হাসিনা রেজিম বিতাড়িত হওয়ার পরও, তাদের দরদী লুটেরারা রয়ে গেছেন। নতুন সরকারের লোকদের মধ্যেও ‘চাঁদাবাজি’ চর্চা আছে। এগুলো বন্ধ করতে পারলে, সব সেক্টরের অসততা কমে আসবে।

২.  এবার আসা যাক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যাপারে। তাদের অধিকাংশেরই লাইসেন্স এক্সপায়ার হয়ে গেছে। সেগুলো রিনিউ করার তাগিদ তাদের মধ্যে নেই। তাদের জনবল ঠিকঠাক মতো আছে কি নেই, তাও খোঁজ নেওয়ার মতো স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এ-কথা বললাম এ-কথা মনে রেখে যে, মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালের তিন বছর ধরে লাইসেন্স নেই। তারা একবারও ভাবেননি যে, অবৈধ হয়ে গেছেন। অবৈধ হলে কি তাদের কাজ থেমে যাবে? না, যাবে না। সেটাই তো প্রমাণ হলো। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। কোথায় কী ফাঁক আছে, তা খুঁজে বের করার কথা একবারও তাদের মনে আসে না। আসলে তারা ‘বিনিময় বিদ্যা’য় পারদর্শী বলে কোনো পরিদর্শনে যান না। এটা এক ধরনের আর্থিক মাসোহারা। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার তদারকি করে দেখা উচিত। আসলে তারা বৈধ নাকি অবৈধ? তাদের চিকিৎসক আছে, কি নেই? তাদের দক্ষ টেকনিশিয়ান আছে, কি নেই। চিকিৎসার নামে যে অপচিকিৎসা চলছে দেশে, সেটা মন্ত্রী মহোদয় আঁচ করতে পারলেও, ভেতরে ঢুকলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়নের স্বরূপটা তিনি অনুধাবন করতে পারবেন। আবার হাসপাতালগুলোকে লালন পালন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসৎ কর্মকর্তারা। তাদের আশকারায়ই চলে অবৈধ কাজ। তারাই এই সেক্টরকে উসকে দেয় নানা রকম আন্দোলন ও অবৈধ পন্থা নেওয়ার। নিজেদের ব্যর্থতা ও অসততার নমুনা ঢেকে রাখার জন্য, তাদের অপতৎপরতার শেষ নেই। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ক্লিনজিং অপারেশন চালাতে হবে। কেননা, ওই দপ্তরের প্রতিটি মানুষই মানসিকভাবে অসৎ। নৈতিকভাবে অসৎ। আচার-আচরণে অসৎ এবং চিকিৎসা পাক গণমানুষ, এটা তারা চান না। সিঙ্গল আউট করে কাউকে দোষী করা যাবে না। এ-টু জেড পর্যন্ত ন্যায়ানুগ বিচার করে, তাদের স্বাস্থ্য প্রশাসন থেকে বের করতে হবে। নতুন ব্লাড যেমন শরীরে ঢোকানো হয় রোগীকে বাঁচাতে, সেই পদ্ধতি নেওয়া যেতে পারে। যাতে সেবা নিশ্চিতে কার্যকর পথ মুক্ত হতে পারে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত