সারা বছর কোরআন চর্চার উপায়

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

রমজান মাস মুসলমানদের জীবনে এক অনন্য প্রশিক্ষণের সময়। এ মাসে কোরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে ওঠে। তেলাওয়াত, তারাবি, তাফসির শোনা ও কোরআন নিয়ে ভাবনার মাধ্যমে হৃদয় আলোকিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, রমজান শেষ হলেই অনেকের সেই উষ্ণ সম্পর্ক ধীরে ধীরে শীতল হয়ে যায়। অথচ কোরআন তো কেবল রমজানের জন্য নয়, এটি আমাদের সারাজীবনের পথপ্রদর্শক। তাই রমজানের পরও কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, কোরআনকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমরা যেমন প্রতিদিন খাবার গ্রহণ করি, তেমনি আত্মার খাদ্য হিসেবেও কোরআনের তেলাওয়াত অপরিহার্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন সেই পথে পরিচালিত করে, যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা ইসরা ৯)

তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কোরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তা অল্প হলেও নিয়মিত হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সেই আমল সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়। (সহিহ বুখারি)

দ্বিতীয়ত, কোরআন শুধু তেলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না রেখে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অনেকেই আরবি পড়েন, কিন্তু অর্থ বুঝেন না। ফলে কোরআনের প্রকৃত বার্তা হৃদয়ে প্রভাব ফেলতে পারে না। রমজানে আমরা যেভাবে তাফসির শুনি বা পড়ি, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। প্রতিদিন কয়েকটি আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে।

তৃতীয়ত, কোরআনের নির্দেশনা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। কোরআন কেবল পাঠ করার জন্য নয়, বরং তা অনুসরণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ ২৯) তাই আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, সবখানে কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।

চতুর্থত, একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রতিদিন অন্তত এক রুকু বা এক পৃষ্ঠা কোরআন তেলাওয়াত করা, সপ্তাহে একটি সুরার তাফসির পড়া অথবা মাসে একবার পুরো কোরআন খতম করার পরিকল্পনা নেওয়া। লক্ষ্য ছোট হলেও তা ধারাবাহিক হওয়া চাই। এতে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দৃঢ় হবে।

পঞ্চমত, কোরআনভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা দরকার। পরিবারে সবাই মিলে কোরআন তেলাওয়াত করা, সন্তানদের কোরআন শেখানো, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কোরআন নিয়ে আলোচনা করা, এসব উদ্যোগ কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করে। একটি ভালো পরিবেশ মানুষকে নেক আমলে উৎসাহিত করে এবং অবহেলা থেকে দূরে রাখে।

ষষ্ঠত, প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা। বর্তমানে বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোরআন তেলাওয়াত ও তাফসির সহজলভ্য। অবসর সময়ে এগুলো ব্যবহার করলে কোরআনের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা সহজ হয়। তবে এ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে নিজেকে সংযত রাখাও জরুরি।

সপ্তমত, দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা শুধু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বিষয় নয়, এটি আল্লাহর তৌফিকের বিষয়ও। তাই নিয়মিত দোয়া করতে হবে, আল্লাহ যেন আমাদের হৃদয়কে কোরআনের প্রতি আকৃষ্ট রাখেন এবং তা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রমজান প্রশিক্ষণের মাস, আর বাকি এগারো মাস তার বাস্তব প্রয়োগের সময়। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা ধরে রাখতে না পারি, তাহলে সেই সাধনার পূর্ণতা আসবে না।

আসুন, আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই, রমজানের পরও কোরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অটুট রাখব। নিয়মিত তেলাওয়াত, অর্থ বোঝা, আমল করা এবং অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার মাধ্যমে কোরআনকে জীবনের অংশ বানাব। তখনই কোরআন আমাদের জন্য হবে সত্যিকারের হেদায়াত, রহমত ও নাজাতের উপায়।

লেখক : মুহাদ্দিস, দারুল উলুম বাগে জান্নাত নারায়ণগঞ্জ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত