ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সুনামগঞ্জের ১২ জন তরুণ ও যুবক চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছেন ভূমধ্যসাগরে। তাদের লাশও আর কোনোদিন পাবে না তাদের পরিবার। ওই ১২ জনের বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানের বুকফাটা আর্তনাদ সবাইকে কাঁদাচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা জুড়ে বইছে শোকের ছায়া।
লিবিয়া থেকে নৌকায় সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথহারানো ওই নৌকায় মারা যাওয়া ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জ জেলার। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ভাসতে থাকে। এতে খাবারের অভাবে তারা মারা যান। মরার আগে একফোঁটা পানিও জোটেনি তাদের। পরে সবার লাশ সাগরেই ফেলে দেন নৌকায় থাকা অন্য যাত্রীরা।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত। দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন ও দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন রয়েছেন।’
নিহতরা হলেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সোহান মিয়া (২৬), একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৬), মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩৫) ও বাসুরি গ্রামের সুহাস মিয়া (৩০), দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম (৩০), জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান (২৮), টিয়ারগাঁও গ্রামের সায়েক আহমদ (৩০), চিলাউড়া গ্রামের মোহাম্মদ নাঈম মিয়া (৩৫), পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (২৬) ও ইছাগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী (৩০)।
নিহতদের পরিবারের লোকজন জানান, দালালের মাধ্যমে জনপ্রতি ১৩ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিরা বাড়ি থেকে রওনা হন। সহায়-সম্বল, জমি বেচে অনেকে স্বপ্নের দেশে যাওয়ার জন্য যাত্রা করেছিলেন তারা। আর সেই যাত্রায় ভূমধ্যসাগরে চিরতরে থেমে গেছে তাদের জীবনের পথচলা।
মৃত্যুর খবর জানার পর থেকে শোকের মাতম চলছে নিহতদের পরিবারে। স্বজনদের আহাজারি যেন থামছেই না। তারা চান স্বজনের লাশ ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা।
সাগরে মারা যাওয়া জগন্নাথপুরের মোহাম্মদ নাঈম মিয়ার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খবর শুনে মা আঁখি বেগম বুকফাটা আর্তনাদ করছেন। নাঈমের স্ত্রী আয়েশা আক্তার স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। নাঈম-আয়েশা দম্পতির ছোট একটি কন্যাশিশুও রয়েছে। সন্তান কোলে নিয়ে আয়েশা শুধুই আহাজারি করছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গত বছরের ডিসেম্বরে পাশের গ্রামের আজিজ নামের এক দালালের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকায় লিবিয়া যান নাঈম মিয়া। দীর্ঘদিন লিবিয়া আটকা থাকার পর কথা ছিল গত ২১ মার্চ সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাবেন তিনি। একসঙ্গে ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনাহারে নাঈমসহ সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনদের অভিযোগ, মানব পাচারকারীরা অভিবাসনেচ্ছু প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা করে নিয়েছে। তাদের ইউরোপের দেশ গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। সর্বশেষ সপ্তাহখানেক আগে পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, গত ৬ মার্চ নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছান হবিগঞ্জের এক যুবক। তিনি গ্রিসের একটি আশ্রয় ক্যাম্পে আছেন। গত ২৭ মার্চ ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদেরও ওই ক্যাম্পে রেখেছে দেশটির কোস্ট গার্ড। হবিগঞ্জের ওই যুবকের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী মূলত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ২২ জন অভিবাসনেচ্ছুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের বহনকারী নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ছিল। আর এতেই অনাহারে মৃত্যু হয় ২২ জনের। প্রথমে তাদের লাশ নৌকাতেই রাখা ছিল। এরপর পচন ধরায় লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। ওই নৌকা থেকে জীবিত আরও ২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশের।
জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তার এলাকার দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম তার ওয়ার্ডের দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন। পাইলগাঁও গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, তার ভাই মারা গেছেন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘যেসব দালালের কারণে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’