নেপালের ভয়াবহ বন্যা

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭, উদ্ধার অব্যাহত

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩১ এএম

নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে বুধবারের ভয়াবহ বন্যা ও ধসে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ। আহত হয়েছেন এক হাজার ৪৭৩ জন। পুলিশ জানায়, দুর্যোগ মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজে চার হাজার ৪৭৩ জন পুলিশ সদস্য কাজ করছেন।

বন্যায় বিভিন্ন এলাকায় আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাইরেও নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জানতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে তাদের।

দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যের বরাতে নেপালি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন অন্তত ৯৭৭ জন।

এদিকে, ভয়াবহ ওই বন্যায় আনুমানিক ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)। নেপালে সংস্থাটির প্রতিনিধিদলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেছেন, দেশটিতে নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। আইএফআরসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নেপালে জরুরি সহায়তায় জন্য তারা আড়াই কোটি সুইস ফ্রাঁ (প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড বা তিন কোটি ১০ লাখ ডলার) অর্থায়নের আবেদন জানিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের বিশ্বজুড়ে থাকা নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো হচ্ছে।

বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।

পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে সেই পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।

বন্যার প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। নদীর স্রোতে মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল বন্যাকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছায়।

এখন রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসিতে মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ২২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে। এছাড়া নবলপরাসী পূর্বে ১৩৪, গোর্খায় ৪৬, নুয়াকোটে ৩৭, ধাদিংয়ে ৩৩, তানাহুনে ২৮, নবলপরাসী পশ্চিমে ২৭ এবং রাসুয়ায় ১২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। যাদের জীবিত উদ্ধার করা গেছে, তাদের মধ্যে ৭৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন; তাদের মধ্যে রাসুয়ায় ৪৩, নুয়াকোটে ২৭ এবং ধাদিংয়ে তিনজন।

নিখোঁজ ৯৭৭ জনের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া ১২৭ জন অনাবাসী নেপালি, রাসুয়া জেলা জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের তালিকায় থাকা ১৬১ জন, মাকওয়ানপুরের তালিকায় ৬৬ জন এবং নুয়াকোটের একজন রয়েছেন।

নিরাপত্তা ও সরকারি দায়িত্বে থাকা আরও ১০৫ জনও নিখোঁজ। তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫, পুলিশের ২৮, কাস্টমস কার্যালয়ের ১৫, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ এবং অভিবাসন কার্যালয়ের চারজন রয়েছেন। তবে নিখোঁজের তালিকা এখনো চূড়ান্ত নয়। তালিকায় থাকা কেউ নিরাপদে অন্য কোথাও পৌঁছেছেন কি না, তা যাচাই করছে কর্তৃপক্ষ।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বন্যাকবলিত রাসুয়া থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯জন দক্ষিণ কোরীয়, দুজন মার্কিন ও দুজন ইতালীয় নাগরিক। আরও তিনজনের জাতীয়তা তখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। মোট ১৪ হাজার ৮২৯ জন নিরাপত্তাকর্মীকে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৬ হাজার ৬৯৮, পুলিশের ৪ হাজার ৪৭৩ এবং সশস্ত্র পুলিশের ৩ হাজার ৬৫৮ জন।

হেলিকপ্টারে করে ৩ হাজার ৭৪২ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; এ কাজে সেনাবাহিনী ও বেসরকারি অপারেটররা মিলে ৭৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন।

তবে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন বড় সংকট হয়ে উঠেছে উদ্ধার হওয়া মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা।

চিতওয়ানে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ১৮৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে রাখা সম্ভব ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ। এ কারণে ভারতপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব হবে।

নবলপরাসী পূর্ব জেলাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জায়গা না থাকায় সেখান থেকে মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে।

কাওয়াসোটির একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পোখারায় তানাহুন, গোরখা, নাওয়ালপরাসি ইস্ট ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে।

কাসকি জেলার হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত মর্গের ধারণক্ষমতা ৮৮টি হওয়ায় সেখানেও ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।

মরদেহ শনাক্ত করতে পুলিশ ছবি তুলছে, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করছে, ময়নাতদন্ত করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা নিচ্ছে। ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুর নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে।

যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না, সেগুলোর জন্যও কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি মরদেহকে একটি নম্বর দেওয়া হবে এবং দাফনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে পরে ডিএনএ বা অন্য কোনো প্রমাণের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হলে মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করা যায়।

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ভাটির এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে চিতওয়ানে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে নিয়ে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের কাছে অপেক্ষা করছেন।

এদিকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ভূমিধসে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে চীনের তিব্বত অংশে ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় হ্রদ তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার সেই বাঁধ উপচে পড়ার খবরে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

সরকার রাসুয়া ও নুয়াকোটকে তাৎক্ষণিক ১ কোটি নেপালি রুপি করে এবং ধাদিংকে ৫০ লাখ রুপি নগদ সহায়তা দিয়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ৩০টি ট্রাক ও চারটি বিমান কার্গো চালানও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রী ও সব মন্ত্রীর এক মাসের বেতন ও পারিশ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারত অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। তৃতীয় সামরিক উড়োজাহাজে আরও ১২ টন ত্রাণসামগ্রী নেপালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে; এর আগে দুটি চালানে ৪৭ টনের বেশি ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। দেশটি ৫ লাখ ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় একজন পরামর্শক পাঠানোর কথা জানিয়েছে।

তবে বন্যা শুরুর দুই দিন পরও পুরো পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট হয়নি। একদিকে জীবিতদের সন্ধান ও নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলছে, অন্যদিকে ক্রমশ বাড়তে থাকা মরদেহের ব্যবস্থাপনা, শনাক্তকরণ এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় নতুন করে পানির প্রবাহ বাড়ে কি না, সেটিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত