মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল সোমবার রাজধানী নেপিদোতে এক অনুষ্ঠানে জেনারেল হ্লাইং সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফের পদটি অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জেনারেল ইয়ে উইন উ-য়ের কাছে হস্তান্তর করেন। উইন উ ২০২০ সালে মিয়ানমারের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর চলতি মাসের ৪ তারিখে তিনি দেশটির সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসামরিক প্রশাসনের আড়ালে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছেন মিন অং হ্লাইং।
জেনারেল উইন উ-কে হ্লাইং অত্যন্ত আস্থাভাজন একজন কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। বিদায়ী ভাষণে মিন অং হ্লাইং বলেন, আমি জনগণ, সেনাবাহিনী এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কাজ চালিয়ে যাব। ৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ২০২১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চি-র নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল হ্লাইং। তারপর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চলমান এই সংঘাতে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ নিহত এবং ৩৬ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
গৃহযুদ্ধের মধ্যেই গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক কর্র্তৃত্বের অধীনে হওয়া এ নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর সমর্থিত একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দেশটির নবগঠিত নিম্নকক্ষের আইনপ্রণেতাদের দ্বারা মনোনীত দুই ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর একজন হিসেবে মনোনীত হয়েছেন তিনি। উচ্চকক্ষ থেকেও একজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে উভয় কক্ষের ভোটে এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন করা হবে। তবে সেই ভোটের তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত সংসদীয় অধিবেশন অনুযায়ী, সামরিকপন্থি দলের একজন আইনপ্রণেতা কিয়াউ কিয়াউ থেকে নিম্নকক্ষে হ্লাইংকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেন। মিয়ানমারের বিতর্কিত নির্বাচনে সু চির দলসহ বিরোধীদের বাদ দেওয়ায় সামরিক-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির জয় নিশ্চিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে সেনা সমর্থিত দলের জয়লাভকে জাতিসংঘ এবং অনেক পশ্চিমা দেশ ‘প্রহসন’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং সরাসরি সামরিক শাসন থেকে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনে’ যেতে চান। স্বাধীন বিশ্লেষক হটিন কিয়াও আই রয়টার্সকে বলেন, এটাই সবসময় মিন অং হ্লাইংয়ের লক্ষ্য ছিল।
সাধারণ নির্বাচন শান্তির পথ প্রশস্ত করবে এমনটাই দাবি করেছিল মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন জান্তা সরকার। তবে বিতর্ক ও সব অভিযোগ-সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে সামরিক জান্তার দাবি, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। মিয়ানমারের নতুন পার্লামেন্টের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য মিন অং হ্লাইংয়ের অনুগত। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত, তাদের নির্বাচনে লড়তে হয়নি। বাকি সদস্যরা সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলের হয়ে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট কে হবেন, আগামী কয়েক দিন তা নিয়েই পার্লামেন্টে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটা বলাই যায়, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংই দেশটির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন মিয়ানমারের নতুন পার্লামেন্ট মূলত বর্তমান সামরিক জান্তারই একটি বর্ধিত রূপ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পার্থক্য- এবার জেনারেলরা সামরিক উর্দি ছেড়ে বেসামরিক পোশাকে দেশ শাসন করবেন।