চট্টগ্রামে তান্ডব চালাচ্ছে বড় সাজ্জাদ বাহিনী

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

চট্টগ্রাম শহরে চাঁদা না দেওয়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে পুলিশি পাহারায় থাকা শীর্ষ এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গোলাবর্ষণ করেছে মুখোশ পরা কিছু অস্ত্রধারী। এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর এক বিএনপি নেতার নির্বাচনী জনসংযোগে খুব কাছে থেকে সরোয়ার বাবলা নামে এক ‘সন্ত্রাসীকে’ গুলি করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৩০ মার্চ চলন্ত গাড়িতে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় দুজনকে। এসব ঘটনায় ‘সন্ত্রাসীরা’ ব্যবহার করেছে এমএমজি ও রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র।

পুলিশের দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ বাহিনীর কিছু প্রশিক্ষিত শুটার এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। নগরের চন্দনপুরায় এলাকায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে চাপের মুখে অস্ত্রধারীদের ধরতে গত ২ মার্চ থেকে ‘এস ড্রাইভ’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করে সিএমপি।

গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনের বিশেষ অভিযানে ৭০৫ ‘অপরাধীকে’ গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে একটি করে বিদেশি স্টেনগান, এসএমসি, ওয়ান শুটারগান, তিনটি বিদেশি পিস্তল ও বিদেশি রিভলভার। কিন্তু বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করা ৭০৫ ‘অপরাধীর’ মধ্যে নেই একজন প্রশিক্ষিত শুটারও।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার এবং অপরাধ আখড়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে টার্গেট কিলিং। গত ১৯ মাসের ব্যবধানে নগরের বায়েজিদ এবং বাকলিয়া থানা এলাকায় একাধিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।

ভুক্তভোগী ও পুলিশের দাবি, খুনের এসব ঘটনার বেশির ভাগের নেপথ্যে ছিল বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল দখল, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গা দখল-বেদখলকেন্দ্রিক।

নিরাপত্তা-বিশ্লেষকরা মনে করেন, চট্টগ্রাম শহরে একের পর এক টার্গেট কিলিং জননিরাপত্তার জন্য চরম অশনিসংকেত। আতঙ্কের বিষয় হলো চাঁদাবাজি কিংবা খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সাবমেশিনগান (এসএমজি) ও চায়নিজ রাইফেল।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঘটনাগুলোর নেপথ্যে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর অনুসারী। চট্টগ্রামে তার বাহিনীতে রয়েছে অর্ধশত প্রশিক্ষিত শুটার। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সাজ্জাদ বাহিনীর প্রশিক্ষিত শুটারদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। নগরের চন্দনপুরা এলাকায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনায় গত ১১ মার্চ একটি সাবমেশিনগান, ব্রাজিলের তৈরি ৯ এমএম টরাস পিস্তল ও পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি বিদেশি রিভলভারসহ আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে ইমন, মোহাম্মদ মনির ও মোহাম্মদ সায়েম নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় অস্ত্রধারীদের বহনকারী গাড়ির চালক মুজিবুর রহমান নামে আরও একজনকে দুদিন আগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার (ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ) তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের চকবাজার থানার এসআই প্রকাশ রায় বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মুজিবুর। জবানবন্দিতে তিনি (মুজিবুর) জানান, চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে গুলির ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের সহযোগী আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ইমন ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মোবারক হোসেন ইমন।’

পুলিশের তথ্যমতে, সাজ্জাদ বাহিনীতে সক্রিয় অর্ধশত প্রশিক্ষিত শুটার চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গত ১৯ মাসে চট্টগ্রাম শহর ও জেলার রাউজান থানা এলাকায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর হাতে খুন হয়েছেন ৩০ জনের বেশি ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মী। সাজ্জাদ বাহিনীর একের পর এক খুনের ঘটনা আতঙ্কিত করে তুলেছে চট্টগ্রামবাসীকে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যার নেতৃত্বে অশান্ত চট্টগ্রাম। সেই বড় সাজ্জাদের নাগাল পাচ্ছে না পুলিশ। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টার কথা সিএমপির কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন জানিয়ে এলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’

‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বড় সাজ্জাদকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার স্যার বিষয়টি দেখছেন। তবে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কাজ চলমান।’

এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘পুলিশ অপরাধীদের শনাক্তের দাবি করছে। কিন্তু ঘটনার নেপথ্য নায়কদের বা তাদের অস্ত্রের উৎসের নাগাল পায়নি। বিদেশে বসে নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন সাজ্জাদ। আর দেশে তার সহযোগীরা একের পর এক খুন করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষম নয়।’

জানা গেছে, বড় সাজ্জাদের হয়ে দেশে দীর্ঘদিন তার সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। গত বছরের ১৫ মার্চ কারাগারে যাওয়ার পর দলের নেতৃত্বে আসেন ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন।

সিএমপির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকা- ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মোবারক হোসেন ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হানের নাম উঠে এসেছে। রায়হান ফেসবুকে সরব থাকলেও তাকে খুঁজে পায়নি পুলিশ। “সন্ত্রাসী” ইমন ও রায়হান চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।’

পুলিশ আরও জানায়, বিদেশে বড় সাজ্জাদ এবং দেশে রায়হান ও মোবারকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের দলের শুটাররা খুনসহ সন্ত্রাসীমূলক কর্মকা-ে অংশ নেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা কারও সঙ্গে বিরোধে জড়ালেই মূলত এসব শুটারকে ব্যবহার করা হয়। আগে রায়হান ও মোবারক সরাসরি মাঠে গিয়ে এ ধরনের ঘটনায় অংশ নেন।

বড় সাজ্জাদ বাহিনীর প্রশিক্ষিত শুটারদের মধ্যে রয়েছেন রাশেদ, ধামা ইলিয়াছ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক, এরশাদসহ অন্তত ৫০ জন।

পুলিশ জানায়, দুই দশক ধরে বিদেশে বসেই সাজ্জাদ আলী খান নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। ওই মামলায় সাজ্জাদ খালাস পান।

২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছয় নেতাকর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকা-ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে তিনি দেশ ছাড়েন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত