কেউ চান দলীয় পদ কেউ জেলা পরিষদ-সিডিএ

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৭ এএম

দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী পেতে দৌড়ঝাঁপ চলছে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাদের মধ্যে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই হলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত নেতা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের দুটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে চলছে নেতাকর্মীদের জোর লবিং। তদবিরের কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও দলের জন্য নিজেদের দীর্ঘ ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়নের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন অনেকে।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের মোট ১৬টি আসনে অর্ধশতাধিক বিএনপি নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও শেষপর্যন্ত দু’একজন ছাড়া বাকি সবাই দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যান। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন দলের সিনিয়র ও দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা। ওই সময় দল নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করা হবে বলেও দলের পক্ষ থেকে আশ^াস দেওয়া হয়। নির্বাচনে ১৪টি আসনে জয় পায় বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীরা। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণেই জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যায় চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের বিএনপি প্রার্থী। বাঁশখালীর মতো অন্যান্য আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে থাকলে ধানের শীষের এমন বিজয় সম্ভব হতো কিনা তা নিয়েও সংশয় ছিল।

দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিতদের ত্যাগের মূল্যায়নের বিষয়টি এখন দলের নীতি-নির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে কাউকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, কাউকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ, আবার কাউকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনসহ সম্মানজনক বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। আবার নেতাদের অনেকে সরকার ও দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রাখছেন।

দলের ত্যাগী নেতাদের অনেকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পদ-পদবীর লোভ বাদ দিয়ে কেবল দলীয় রাজনীতির সঙ্গে থাকতে চান। এরা পেতে চান দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা দীর্ঘদিন ধরে চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। আবার উত্তর জেলায় কোনো কমিটিই নেই। এসব কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু না হলেও শীঘ্রই তা শুরু হবে বলে জানিয়েছে দলের দায়িত্বশীল সূত্র। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কমিটির সদস্য সচিব চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়েও পাননি। ওই আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হন সরকারের বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় রয়েছে মনোনয়নবঞ্চিত নাজিমুর রহমানের নাম। পাশাপাশি মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল ও ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আজিম উল্লাহ বাহারের নাম। এদের মধ্যে আবুল হাশেম বক্কর ও আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে এবং আজিম উল্লাহ বাহার চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমকে ৩ বছরের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখনো তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেখানে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. মোতাহার হোসেন। সেখানেও দলীয় নেতাদের কাউকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যে জেলা পরিষদের সম্ভাব্য প্রশাসক হিসেবে চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার আলোচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন, উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন ও ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আজিম উল্লাহ বাহারের নাম।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে।

এদিকে খুব শীঘ্রই চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র। নতুন কমিটিতে সম্ভাব্য সভাপতি হিসেবে বর্তমান সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান ও মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির নাম। পাশাপাশি বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল ও ইয়াসিন চৌধুরী লিটনের নামও রয়েছে আলোচনায়।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে আমি কখনো কোনো পদ চেয়ে নিইনি। কাউন্সিলের মাধ্যমে মহানগর ছাত্রদলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। সর্বশেষ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বিগত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আগামীতেও দল আমাকে যেখানে উপযুক্ত মনে করবে সেখানে রাখবে-এর বাইরে কিছু নেই।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন মো. হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের আমলে জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিএনপির ঝা-াকে উড্ডীন রাখার জন্য কাজ করেছি। বিগত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য দলের নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনসাধারণের দাবি ও চাপ থাকা সত্ত্বেও দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নিজের প্রার্থিতা সরিয়ে নিয়েছি। পাশাপাশি আমাদের দলের প্রতীক ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনে গণজোয়ার তৈরিতে কাজ করেছি। আশা করি, দল এই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে। আগামীতেও দলীয় যেকোনো সিদ্ধান্তকে অবশ্যই সম্মান জানাব।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মীর ইচ্ছে ও লক্ষ্য থাকে সংসদ সদস্য হয়ে সংসদে গিয়ে জনগণের জন্য কথা বলার। আমিও বিএনপির একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু দল যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা মাথা পেতে নিয়েছি। আমি রাজনীতির মাঠের কর্মী। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলন সংগ্রামে সবসময় মাঠে ছিলাম ও আছি। জুলুম, নির্যাতন, হামলা-হামলার শিকার হয়েছি, কারাগারে গিয়েছি। কিন্তু পিছু হটিনি। আগামীতেও মাঠের রাজনীতিতে থাকতে চাই। এক্ষেত্রে দল আমাকে রাজনীতির যে জায়গায় যোগ্য মনে করবে সেখানেই কাজে লাগাবে এটাই আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত