 চিকিৎসায় সাফল্য

গর্ভে যমজ শিশুর অস্ত্রোপচার

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

বাংলাদেশে এই প্রথম মাতৃগর্ভে থাকা যমজ সন্তানের মধ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ শিশুর রক্তসঞ্চালন বন্ধ করার অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্ অ্যান্ড গাইনি বিভাগের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন ইউনিটে এই নতুন অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করা হয়। সফল এই অপারেশনের নেতৃত্ব দেন ইউনিটের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজমিরা সুলতানা। তাকে সহযোগিতা করেন সহকারী অধ্যাপক ডা. মাসউদা সুলতানা।  

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২২ আগস্ট ২৬ বছর বয়সী ইয়াসমিন বেগম গর্ভে যমজ শিশুর জটিলতা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের ফিটো-ম্যাটারনাল ইউনিটে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন যমজ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর হার্ট তৈরি হয়নি। অপর শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ। সুস্থ শিশুটির রক্ত নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ শিশুটি বেড়ে উঠছে। এতে করে পরবর্তী সময়ে সুস্থ শিশুর বেড়ে ওঠার ওপর এর প্রভাব পড়বে। চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন আরএফএ বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলিউশন চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ শিশুটিকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচানো সম্ভব। পরে গতকাল সকালে ইয়াসমিন বেগমের এই সফল অপারেশনটি করা হয়। 

ডা. তাজমিরা সুলতানা বলেন, ‘রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় তার পেটে যমজ সন্তান। এর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অপরটির হার্ট তৈরি হয়নি। সুস্থ শিশুটির হার্ট দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ শিশুটির রক্ত সঞ্চালন হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে সাধারণত টিআরএপি (টুইন রিভার্সড আরটিরিয়াল পারফিউশন) সিকোয়েন্স বা অ্যাকার্ডিয়াক টুইন জটিলতা বলা হয়। এখানে যমজ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর হার্ট বা হৃদপি- তৈরি হয় না। সে বেঁচে থাকা সুস্থ শিশুর হার্ট থেকে রক্তের প্রবাহ নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ শিশু কোনোমতে অবয়বহীনভাবে বড় হতে থাকে। এর ফলে সুস্থ শিশুটির হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সেটিও মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সহজ কথায়, এটি হলো মায়ের গর্ভে থাকা একাধিক যমজ সন্তানের মধ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট শিশুর বৃদ্ধি বা রক্তসঞ্চালন বৈজ্ঞানিক উপায়ে বন্ধ করে দেওয়া, যাতে অপর সুস্থ শিশুটি নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।’

তিনি আরও জানান, ‘মাতৃগর্ভে যমজ সন্তান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে কিছু জটিলতা দেখা দেয়, যা অন্য সুস্থ শিশুটির জীবনের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভে থাকা ত্রুটিপূর্ণ শিশুটির রক্তসঞ্চালন বন্ধ করে সুস্থ শিশুটিকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখার পথ সুগম করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধরনের আধুনিক ও জটিল চিকিৎসাসেবা এটাই প্রথম। মাতৃগর্ভে জটিল বিষয়গুলো ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরাই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সরকারি হাসপাতালে এই মানের জটিল অপারেশন সফল হওয়া সাধারণ রোগীদের জন্য নতুন আশার আলো সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

চিকিৎসার খরচের ব্যাপারে ডা. তাজমিরা বলেন, ‘এই অপারেশনটি করতে একটি মেশিন ভাড়া করতে হয়েছে। একটি ডিভাইস কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো খরচ। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে রোগীর অভিভাবকের কাছ থেকে সামান্য টাকা নেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

ইয়াসমিন বেগমের স্বামী শরীফ একজন অটোরিকশা চালক। থাকেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। শরীফ জানান, ‘আমি প্রথমে প্রাইভেট হাসপাতালে একজন গাইনি চিকিৎসক দেখাতাম। গর্ভে যমজ সন্তানের মধ্যে একটির সমস্যা হওয়ার কারণে ওই গাইনি ম্যাডাম আমাকে ডা. তাজমিরা ম্যাডামের কাছে পাঠান। তাজমিরা ম্যাডাম সব দেখে বলেন, একটি শিশুকে পুরোপুরি সুস্থ পেতে চাইলে ছোট একটি অপারেশন করতে হবে। আর যে শিশুটির সমস্যা, তার হার্ট তৈরি হয়নি। ম্যাডাম আমাকে সুন্দর করে বুঝানোর পর আমি রাজি হই। এই অপারেশন করতে যা খরচ, তা আমার কাছে ছিল না। ম্যাডামকে আমি ২০ হাজার টাকা দিই। বাকি টাকা ম্যাডাম জোগাড় করেছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত