সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে কোনো ‘প্রতিকার না পাওয়া’ এবং তাদের প্রস্তাব চাপা দিতে আরেকটি প্রস্তাব আনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। গতকাল বুধবার বিকেলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে বিরোধী সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এর পর সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জনগণের ম্যান্ডেটকে অপমান করায় রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়েই আমরা ওয়াকআউট করেছি। তবে আমরা সংসদ ছেড়ে দিইনি। আমরা এখন আবার সেই জনগণের কাছেই ফিরে যাব। আমাদের ১১টি দলের জোট দ্রুতই একত্রে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে। জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।’
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের রায় অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী তাদের দুটি শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তিনি বলেন, ‘জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে, সংশোধনের জন্য নয়। কিন্তু সরকার জনগণের রায়কে বেমালুম অগ্রাহ্য করে অপমান করেছে। এর প্রতিবাদেই আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি।’
সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করার কথা থাকলেও সরকার তা করেনি। বাধ্য হয়ে আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে নোটিস দিই। শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে আইনমন্ত্রী জনগণের সংস্কারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। আমরা তখনই বলেছি, সংস্কার আর সংশোধন এক জিনিস নয়। সরকার জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে প্রতারণা করছে।’
সে সময় বিগত সরকারের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিগত সাড়ে ১৫ বছরে জনগণের ওপর যে ফ্যাসিবাদ চাপানো হয়েছিল, তার ছাঁদাকলে বিনা বিচারে ২ হাজার ৬৬৩ জন মানুষকে খুন করা হয়েছে। গুম হয়েছেন ২৫০ জনের বেশি মানুষ, যাদের খোঁজ আজও মেলেনি। আয়নাঘরের মতো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করে মানুষকে ৮-৯ বছর বন্দি রাখা হয়েছে। সেই অমানবিক ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান এবং সংবিধান সংস্কারের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।’
এর আগে গতকাল বুধবার স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে। প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, গতকাল (মঙ্গলবার) যে এজেন্ডাটা আমরা উত্থাপন করেছিলাম এটা ছিল মূলত গণভোট ও গণভোটের রায়ের আলোকে সংস্কারের প্রস্তাব। এজন্য যে পরিষদটা গঠন হওয়ার কথা সেই পরিষদের সভা আহ্বান সংক্রান্ত। এটাই ছিল মূল নোটিসের বিষয়। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবে আমি রেসপন্স দিতে গিয়ে বলেছিলাম যে যেহেতু আলোচনাটা হয়েছে সংস্কার পরিষদের ওপর, যদি এইটাকে কেন্দ্র করে কোনো কমিটি, বিশেষ কমিটি গঠন হয় তাহলে আমরা ইতিবাচকভাবে সেটা ভেবে দেখব। এবং একই সঙ্গে বলেছিলাম যে সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল থেকে সমানসংখ্যক সদস্য নিলে এটা অর্থবহ একটা কমিটি হিসেবে রূপ নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আগের দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে মুলতবি প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে স্পিকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যেহেতু এটা জন-আকাক্সক্ষার বিষয়, গণভোটের বিষয়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের বিষয়, তাই তারা প্রত্যাশা করেছিলেন স্পিকারের মাধ্যমে প্রতিকার পাবেন। তিনি স্পিকারকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হলো কিনা, তা তিনি বুঝতে পারেননি। বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে জানতে চান।
এর জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবটি ছিল একটি মুলতবি প্রস্তাব। এটি তার অনুপস্থিতিতে হয়েছিল। দেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে মাত্র তিনটি মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। প্রাণবন্ত আলোচনার জন্য ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছিল।
স্পিকার বলেন, যে সমস্যার সমাধান আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই কেবল করা যায়, সেটি নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব হতে পারে না। তার পরও উদারভাবে কথা বলতে চাইলে সেটা বিবেচনা করা হবে। এ বিষয়ে বিরোধী দলের আরও বক্তব্য থাকলে সে সুযোগ দেওয়া হবে। এর জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা প্রতিকার চেয়েছেন। বিষয়টি কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের আগে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই একমত হয়েছে, সপক্ষে কথাও বলেছে, ক্যাম্পেইন করেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা প্রতিকার যে পেলাম না, এটা আমরা না, এটা দেশবাসী। তাদের রায়ের প্রতিফলন হলো না, মূল্যায়ন হলো না, আমরা বিরোধী দলে বসে এই অবমূল্যায়ন মেনে নিতে পারি না। এ জন্য তার প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।’
তখন বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা, আপনি আমার বক্তব্য তো সম্পূর্ণ করতে দিলেন না। আমি আপনার পুরো বক্তব্য শুনেছি। ওয়াকআউট করা আপনাদের অধিকার। কিন্তু আমি বলতে চাই, আজকে একটু পরে আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব বিবেচিত হবে। সেখানে আমার মনে হয় যে আপনি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং সেখানে মন খুলে আপনারা আরও কথা বলতে পারবেন।’
এর জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ওই নোটিসও তাদের নজরে এসেছে। তিনি মনে করেন, মূল নোটিস (বিরোধী দলেরটা) ও নতুন নোটিস চাপা দেওয়ার জন্য সামনে আনা হয়েছে। এ জন্য উভয় নোটিসের প্রতিবাদেই তারা সংসদ থেকে আপাতত ওয়াকআউট করছেন।
তখন স্পিকার বলেন, ‘নোটিসই তো উত্থাপন হয়নি। আপনি কী করে বুঝলেন কোনটা চাপা দেওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে? আমি অনুরোধ করছি, একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। নোটিসের বিষয়বস্তু শুনুন।’ জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এর আগে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে নোটিসটি সংশ্লিষ্ট সদস্য পড়েছেন। তারা সেটা শুনেছেন। বুঝেশুনেই তিনি বলছেন যে দুই কারণে তারা ওয়াকআউট করছেন।’ তখন স্পিকার বলেন, ‘সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আপনারা ওয়াকআউট করতে পারেন।’ এরপর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই সংসদের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নেন। এ সময় তিনি বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতিতে ওয়াকআউট একটি স্বাভাবিক বিষয়, তবে আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে যে কথাগুলো রেকর্ডেড হয়ে গেল তার বিপরীতে আমাদের বক্তব্যটা এক-দুই মিনিট রেকর্ডে থাকা ভালো। যে মুলতবি প্রস্তাবটা আপনার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার প্রিসাইড করেছেন উনি গ্রহণ করেছিলেন। তখনই আমি আপত্তি উত্থাপন করেছিলাম যেটা ৬৮ বিধিতে হতে পারে। কিন্তু মূলত প্রস্তাব, যে রুলস অব প্রসেস আছে তার মধ্যে আপনি রাইটলি আইডেন্টিফাইড করেছেন সেটা আমি আগে উত্থাপন করেছি। যে বিষয়টি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে সে রকম কোনো বিষয় মুলতবি প্রস্তাবে আলোচনা করার বিধান নেই। এটা আপনাদের উদারতা, হাউজের অভিভাবক হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে। আপনি আলোচনার জন্য রেখেছেন এবং সেটা দুই ঘণ্টা আলোচনার জন্য সময় নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু নিষ্পত্তি কি হবে সেজন্য ভোটাভুটি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো মুলতবি প্রস্তাব এখানে রিড আউট করিনি। উনি (বিরোধী দলের নেতা) যেটা বলেছেন সেটা অসত্য বলেছেন, যেটা মুলতবি প্রস্তাব আমিও শুনেছি। আজকে একজন বেসরকারি সদস্য উত্থাপন করতে পারেন। সেটা আপনাকে বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু একই বিষয়ে আপনি বিরোধী দলের নেতার একই রকম মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। এজ এ ম্যাটার অব রাইট বেসরকারি সদস্য সেটা ক্লেইম করতে পারে।
