পৃথিবীতে এমন কিছু খেলা আছে, যেখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। এক সেকেন্ডের ভুল মানে হতে পারে নিশ্চিত মৃত্যু। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
মানুষের আদিম প্রবৃত্তির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে অজানাকে জানার কৌতূহল আর ভয়কে জয় করার নেশা। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ নিজের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিনোদন বা খেলাধুলার জগৎ যখন সাধারণ গণ্ডি পেরিয়ে জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে গিয়ে দাঁড়ায়, তখনই জন্ম নেয় বিশ্বের এই সব থেকে বিপজ্জনক রোমাঞ্চকর কর্মকাণ্ডগুলো। এখানে প্রতিটি মুহূর্তের সিদ্ধান্ত মানেই হলো বেঁচে থাকা অথবা চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। উচ্চতার শূন্যতা, সমুদ্রের দানবীয় ঢেউ কিংবা গতির উন্মাদনা সবকিছুর পেছনেই কাজ করে এক অদম্য জেদ।
বেস জাম্পিং
বেস জাম্পিংকে আধুনিক বিশে^র সব থেকে ভয়ংকর খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই নামের প্রতিটি অক্ষর একেকটি নির্দিষ্ট উচ্চতাকে নির্দেশ করে বি তে বিল্ডিং বা দালান, এ তে অ্যান্টেনা বা টাওয়ার, এস তে স্প্যান বা ব্রিজ এবং ই তে আর্থ বা পাহাড়ের চূড়া। সাধারণ স্কাইডাইভিংয়ে যেখানে কয়েক হাজার ফুট ওপর থেকে লাফ দেওয়া হয়, সেখানে এই খেলায় উচ্চতা থাকে অনেক কম। উচ্চতা কম হওয়ার কারণে প্যারাশুট খোলার জন্য জাম্পাররা মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পান। বাতাসের সামান্য পরিবর্তন বা শরীরের ভারসাম্যের সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে প্যারাশুটটি দালান বা পাহাড়ের গায়ে আটকে যেতে পারে, যা নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনে। এই খেলায় কোনো সংরক্ষিত বা অতিরিক্ত প্যারাশুট থাকে না, কারণ দ্বিতীয় একটি ব্যবস্থা কার্যকর করার মতো সময় বা উচ্চতা এখানে পাওয়া অসম্ভব। যারা এই খেলায় অংশ নেন, তাদের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব নিখুঁত হতে হয়। সামান্যতম যান্ত্রিক ত্রুটি বা মনোযোগের অভাব এখানে ক্ষমার অযোগ্য। মূলত এই চরম অনিশ্চয়তা এবং মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার নেশাই দুঃসাহসী মানুষদের এই খেলার দিকে টেনে নিয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশে এই খেলাটি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এর জনপ্রিয়তা কমেনি।
ফ্রি সোলো ক্লাইম্বিং
পাহাড় আরোহণ এমনিতেই মানুষের ধৈর্য এবং শক্তির পরীক্ষা নেয়, কিন্তু যখন কোনো প্রকার দড়ি বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া খাড়া পাহাড়ের গায়ে চড়া হয়, তখন তাকে বলা হয় ফ্রি সোলো ক্লাইম্বিং। এই খেলায় আরোহীর সঙ্গে থাকে কেবল তার শরীরের শক্তি, অদম্য মানসিক সাহস এবং আঙুলের ডগায় লাগানো সামান্য চকের গুঁড়ো। কয়েক হাজার ফুট উঁচু গ্রানাইটের দেয়ালে যখন একজন আরোহী ঝুলে থাকেন, তখন তার আর মাটির মাঝে ব্যবধান থাকে কেবল তার হাতের মুঠো। এখানে একটি ভুল পদক্ষেপ বা পাথরের একটি আলগা টুকরো মানেই জীবনাবসান। আরোহীকে প্রতিটি মুহূর্তের জন্য অত্যন্ত সজাগ থাকতে হয়। আবহাওয়া যদি হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় বা বাতাসের গতি বেড়ে যায়, তবে সেই অবস্থায় নিজেকে পাথরের সঙ্গে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি শারীরিক সক্ষমতার চেয়েও বেশি মানসিক একাগ্রতার খেলা। অনেক বিখ্যাত আরোহী এই খেলায় প্রাণ হারিয়েছেন, তবুও নতুন নতুন আরোহীরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথটি বেছে নেন। এটি এমন এক সাধনা, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে থাকে মৃত্যুর হাতছানি।
বিগ ওয়েভ সার্ফিং
সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে চলা অনেক সার্ফারের স্বপ্ন থাকে, কিন্তু বিগ ওয়েভ সার্ফিং সেই স্বপ্নকে এক ভয়ংকর বাস্তবতায় রূপ দেয়। এখানে সার্ফাররা অন্তত পঞ্চাশ থেকে একশ ফুট উঁচু ঢেউয়ের মোকাবিলা করেন। এই বিশাল ঢেউগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন তার নিচে কয়েক হাজার টন পানির চাপ তৈরি হয়। কোনো সার্ফার যদি একবার ভারসাম্য হারিয়ে সেই পানির নিচে তলিয়ে যান, তবে সেই প্রচণ্ড চাপে তার হাড় ভেঙে যেতে পারে বা তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন। পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ দম আটকে রাখা এবং ঢেউয়ের প্রচণ্ড ঘূর্ণি থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্রের তলদেশের ধারালো প্রবাল বা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারাত্মক জখম হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই খেলায় সার্ফারদের সাহায্য করার জন্য অনেক সময় জেট স্কি ব্যবহার করা হয়, তবুও প্রকৃতির এই অসীম শক্তির সামনে মানুষ বড়ই অসহায়। ঢেউয়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই কয়েক সেকেন্ড সার্ফারের কাছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সময় বলে মনে হয়, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে কোনো দেয়াল থাকে না।
আইল অব ম্যান টিটি
মোটরসাইকেল রেসিংয়ের জগতে আইল অব ম্যান টিটি হলো সাহসিকতার চরম পরীক্ষা। এটি কোনো সাজানো গোছানো রেসিং সার্কিটে হয় না, বরং সাধারণ জনপথের সরু রাস্তায় এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। রাস্তার দুই পাশে কোনো ঘাসের মাঠ বা সুরক্ষা দেয়াল থাকে না, বরং থাকে পাথরের দেয়াল, ঘরবাড়ি, ল্যাম্পপোস্ট এবং গাছপালা। এখানে প্রতিযোগীরা ঘণ্টায় প্রায় তিনশ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে মোটরসাইকেল চালান। রাস্তার সামান্য অসমতলতা বা গর্ত এই গতিতে মোটরসাইকেলের চাকা নিয়ন্ত্রণহীন করে দিতে পারে। এই রেসের ট্র্যাকে দুইশোরও বেশি বাঁক রয়েছে, যার প্রতিটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রেসিংয়ের সময় মোটরসাইকেলগুলো মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে কয়েক ফুট শূন্যে লাফিয়ে ওঠে, যা নিয়ন্ত্রণ করা সাধারণ চালকের পক্ষে অসম্ভব। গত একশ বছরে এই প্রতিযোগিতায় কয়েকশ প্রতিযোগী প্রাণ হারিয়েছেন। গতির নেশা যখন মানুষের মগজে চড়ে বসে, তখন তারা এই মৃত্যুকূপের দিকেই বারবার ফিরে আসে। এটি পৃথিবীর এমন এক রেস, যেখানে জয়ী হওয়া মানে কেবল পুরস্কার পাওয়া নয়, বরং এক নতুন জীবন ফিরে পাওয়া।
আইস ক্লাইম্বিং
শীতপ্রধান অঞ্চলে জমে যাওয়া জলপ্রপাত বা পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা পুরু বরফের স্তরে আরোহণ করাই হলো আইস ক্লাইম্বিং। এটি সাধারণ শিলা আরোহণের চেয়ে অনেক গুণ বেশি কঠিন, কারণ বরফের স্তর সবসময় স্থিতিশীল থাকে না। আরোহীরা তাদের পায়ে বিশেষ স্পাইক লাগানো বুট এবং হাতে তীক্ষè কুঠার বা আইস এক্স ব্যবহার করেন। বরফের দেয়ালে প্রতিটি আঘাতের সময় আরোহীকে বুঝতে হয় যে বরফটি কি তার ওজন ধরে রাখতে পারবে নাকি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এ ছাড়া প্রচণ্ড ঠান্ডায় পেশিশক্ত হয়ে যাওয়া এবং তুষার অন্ধত্বের ঝুঁকি থাকে সব সময়। অনেক সময় ওপর থেকে বরফের বড় চাই বা অ্যাভাল্যাঞ্চ বা তুষার ধস নিচে নেমে আসে, যা আরোহীকে নিমেষেই অতলে পাঠিয়ে দিতে পারে। এই খেলায় প্রতিটি সেকেন্ডে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বরফের শীতলতা এবং উচ্চতার এই ভয়ংকর সংমিশ্রণ আইস ক্লাইম্বিংকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রোমাঞ্চে পরিণত করেছে।
উইংস্যুট ফ্লাইং
মানুষের আদিকাল থেকেই পাখির মতো ডানা মেলে ওড়ার তীব্র আকাক্সক্ষা ছিল। সেই আকাক্সক্ষার আধুনিক এবং সব থেকে ভয়ংকর রূপ হলো উইংস্যুট ফ্লাইং। এই খেলায় বিশেষ ধরনের একটি পোশাক ব্যবহার করা হয়, যা হাত এবং পায়ের মাঝে ডানা তৈরি করে। উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফ দেওয়ার পর এই ডানাগুলো বাতাসের বাধা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিকে আকাশপথে অনেকটা দূর ভেসে যেতে সাহায্য করে। এ সময় উড়ন্ত ব্যক্তির গতি থাকে অবিশ্বাস্য বেশি। সামান্য বাতাসের ঝাপটা বা স্যুটের কোনো ত্রুটি ব্যক্তিকে পাহাড়ের গায়ে আছড়ে ফেলতে পারে। অনেক সময় জাম্পাররা পাহাড়ের খুব কাছ দিয়ে বা সরু গুহার ভেতর দিয়ে উড়ে যাওয়ার রোমাঞ্চ নিতে চান, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ মুহূর্তে প্যারাশুট খোলার মাধ্যমে তারা মাটিতে নামেন, কিন্তু তার আগের কয়েক মিনিট তারা পৃথিবীর সব থেকে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকেন। এই খেলায় ভুলের কোনো অবকাশ নেই, কারণ প্রচণ্ড গতিতে ধাক্কা লাগলে বাঁচার কোনো সুযোগ থাকে না।
বুল রাইডিং
বুল রাইডিং বা ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের পিঠে চড়া এক প্রাচীন লড়াই। একটি বিশাল আকৃতির এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ষাঁড়ের পিঠে আরোহীকে এক হাতে দড়ি ধরে অন্তত আট সেকেন্ড টিকে থাকতে হয়। ষাঁড়টিকে কৃত্রিমভাবে উত্তেজিত করা হয়, যাতে সে আরোহীকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে লাফালাফি করে। এই আট সেকেন্ড আরোহীর কাছে আট বছরের মতো মনে হতে পারে। একবার নিচে পড়ে গেলে বিপদ শেষ হয় না, বরং সেই বিশাল ওজনের ষাঁড়টি আরোহীকে তার পায়ের নিচে পিষে ফেলা বা শিং দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করে। এই খেলায় মাথায় চোট পাওয়া, পাঁজরের হাড় ভেঙে যাওয়া এবং ফুসফুসে চোট পাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। যদিও সুরক্ষার জন্য হেলমেট বা বিশেষ জ্যাকেট পরা হয়, কিন্তু ষাঁড়ের প্রচণ্ড শক্তির সামনে তা অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না। এটি মূলত মানুষের শারীরিক ক্ষমতা এবং পশুর আদিম শক্তির এক উন্মত্ত লড়াই।
ফর্মুলা ওয়ান
ফর্মুলা ওয়ান রেসিং কেবল গাড়ির লড়াই নয়, এটি প্রকৌশল এবং মানুষের স্নায়ুর এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই রেসিং কারগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, এগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শূন্য থেকে কয়েকশ কিলোমিটার গতি অর্জন করতে পারে। রেসিং ট্র্যাকের বাঁকগুলোতে যখন গাড়িগুলো প্রচণ্ড গতিতে ঘোরে, তখন চালকের ওপর প্রচণ্ড অভিকর্ষজ চাপ তৈরি হয়, যা সহ্য করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। উচ্চ গতিতে টায়ারের ঘর্ষণ থেকে সৃষ্ট তাপ এবং ইঞ্জিনের গর্জনে চালকের শারীরিক অবস্থা প্রতিকূল হয়ে ওঠে। সামান্য কোনো সংঘর্ষে গাড়ির জ্বালানি ট্যাঙ্কে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বা গাড়িটি উল্টে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। যদিও আধুনিক এফ ওয়ান রেসিংয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত করা হয়েছে, তবুও গতির এই দানবীয় খেলায় ঝুঁকি সবসময়ই থেকে যায়। প্রতিটি ল্যাপ বা চক্করে চালককে তার জীবনের বাজি ধরে লড়াই করতে হয়। এটি গতির নেশা এবং যান্ত্রিক উৎকর্ষের এক অনন্য উদাহরণ।
এই বিপজ্জনক খেলাগুলো কেন মানুষকে এতটা টানে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের অদম্য কৌতূহল এবং ভয়ের ওপর বিজয় লাভের আকাক্সক্ষার মধ্যে। সাধারণ জীবন যখন একঘেয়ে হয়ে ওঠে, তখন কিছু মানুষ নিজের সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করতে চান।
