বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার অফিস সময় ১ ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিমত লক্ষ্য করা গেছে। এর সমাধানে গতকাল শনিবার দুপরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সারা দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী নেতদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ব্যবসায়ীরা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। অনুষ্ঠানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, এমপি এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে মন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময়সীমা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের জাতীয় স্বার্থে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় পহেলা বৈশাখ ছাড়া আপদকালীন সময়ে দেশের কোথাও কোনো মেলা অনুষ্ঠিত হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পেক্ষাপটে সমস্যার সমাধানে আমরা সরকারের সঙ্গে একমত পোষণ করেছি। তবে উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ চেয়েছেন। পরে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অর্থাৎ সামনে বৈশাখ ও কোরবানির ঈদ উপলক্ষে এ সিদ্ধান্ত সিথিল করা হবে, মন্ত্রী সাহেবের এমন প্রতিশ্রুতিতে ব্যবসায়ীরা একমত হয়েছেন। তবে দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে একটি সুদিষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। সেসব বিষয়ে সরকার আন্তরিক হবেন বলে আমরা প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। আশা করছি সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার আমাদের প্রস্তাবনা বাস্তায়ন করবে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণভাবে সাশ্রয়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অফিসের সময় কমানোর পাশাপাশি দোকানপাট বন্ধের সময়সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংকের লেনদেন চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এবং ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। দোকানপাট ও শপিংমলসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো এবং এ সময়ে কোনো নতুন যানবাহন (গাড়ি, জলযান, আকাশযান) ও কম্পিউটার সামগ্রী না কেনার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তও সরকার নিয়েছে। পাশাপাশি বিয়ে বা উৎসবে কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ দেশের সব বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুইটি পক্ষ তৈরি হয়েছিল। তবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য উভয় পক্ষ একমত হয়েছেন। ‘বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি’ পক্ষ থেকে যে বিবৃতি প্রচার পর ‘বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির’ সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ওই দিন তিনি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, শনিবার (গতকাল) দুপুরে জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীদের সঙ্গে সারা দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী নেতাদের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দোকানপাট বন্ধের বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির ১০ প্রস্তাবের মধ্যে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকন খোলা রাখার অনুমতি প্রার্থনা (সভায় বিষয়টি প্রত্যাহর করে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তাবয়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা); সব অবৈধ সংযোগ (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত) বিচ্ছিন্ন করা; যানজট নিরসন করে জ্বালানি অপচয় রোধ করা; সরকারি ও বেসরকারি গাড়ি অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জোড় সংখ্যা একদিন, অন্যদিন বেজোড় সংখ্যার গাড়ি রাস্তায় চলাচল করা;
এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের পরিবর্তে গণ পরিবহনের আওতা বাড়িয়ে দিতে হবে; ৫ আগস্টের পর অনেক নিরীহ ব্যবসায়ীর নামে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। সে বিষয় নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা; কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়া; পচনশীল কৃষি পণ্যের জন্য প্রতিটি জেলায় আধুনিক বহুতল বিশিষ্ট হিমাগার নির্মাণ করা; অনতিবিলম্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনের আয়োজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার আইন যারা প্রয়োগ করেন, তারা অনেক সময় ২০০৯ আইনের অপপ্রয়োগ করেন। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা যাবে না। কিন্তু কর্মকর্তা এমনভাবে তাকে আতঙ্কিত করেন, যা একজন ব্যবসায়ীর আত্ম সম্মানে আঘাত করে। মনে রাখা উচিত, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ অভিযুক্ত নয়। আইনেও এমনটি বলা হয়েছে যে, প্রশাসনিক আচরণ শালীন ও আইনসম্মত হওয়া বাধ্যতামূলক।
