নামেই শিশু আদালত

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১ এএম

সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা কতটা, তার আরেক নজির শিশু আদালত। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও শিশু আইন, ২০১৩-এর বিধান অনুযায়ী আইনের আওতায় আসা শিশু অপরাধীদের বিচার হবে শিশুবান্ধব শিশু আদালতে। কিন্তু শিশু আদালত পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক শিশু আদালতের সৃষ্টির বিধান থাকলেও, গত ১৩ বছরে বিশেষায়িত আদালত হয়েছে মাত্র ১২টি। আবার এই আইনের ভেতরে অসংগতি ও স্ববিরোধী ধারা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। ঢাকার ৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৪ হাজার মামলা জমেছে, কোনো পৃথক শিশু আদালত হয়নি। নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে শিশু অপরাধ বাড়ছে। প্রতিদিন এ প্রবণতার শিকার হচ্ছে অনেক নিরীহ ও গরিব শিশু। তারা অজ্ঞতাপ্রসূত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কোনটা অপরাধমূলক আর কোনটা নয় এটা না জানার ফলেই এমনটা ঘটছে। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাবে এমনটা হচ্ছে। শিশুদের অপরাধ কর্ম থেকে নিবৃত্ত রাখার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার পাশাপাশি স্কুল কারিকুলামে তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

কী করে তাদের নিবৃত রাখতে হবে, সেটা তারা না জানলে, না বুঝলে নিবৃত করা যাবে না। তাই সংশোধনাগারে রাখলেও তারা সংশোধন হবে না। এর জন্য তাদের শিক্ষার পাশে রাখতে হবে প্রশিক্ষণ ও চর্চা। অভ্যাস গড়তে পারলে তারা অপরাধপ্রবণতার সুযোগ পাবে না। সংশোধন ও সমাজের সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে আইনের ব্যবহারের চেয়ে বিচার করার আগে তাদের শিক্ষিত করার বিকল্প নেই। শিশু আদালত কেবল আইনের প্রয়োগ করে অপরাধ নির্ণয় করতে পারবে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। শিশু আইনের ১৬ ধারাকেই স্ববিরোধী বলেছেন একজন আইনবিদ। একদিকে শিশু আদালতের কথা বলা হলেও, উপধারা খ-এ নারী-শিশু ট্রাইব্যুনালকে শিশু আদালত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া স্ববিরোধী। যদি ট্রাইব্যুনালেই শিশুদের বিচার হবে, তাহলে পৃথক শিশু আদালত প্রয়োজন কী? শিশু আদালতের বিচারক কারা হতে পারবেন, সেই প্রশ্নটি উঠে আসে এখানেই। ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারক কি শিশুর অপরাধ ও তার প্রবণতা সম্পর্কে গভীরভাবে বুঝতে পারবেন? শিশু মনস্তত্ত্ব কি সেই বিচারক অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারবেন? দ্বিতীয়ত, সরকার বা উচ্চ আদালত যদি আলাদা শিশু আদালত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আইন প্রণয়ন করে, তাহলে আইনটি যথার্থ হলো না কেন। কেন গোঁজামিল দেওয়া হলো? কেন পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণীত হলো না।

সন্দেহ নেই, শিশু আদালত গড়ে শিশুর অপরাধ নির্ণয় ও তাদের সংশোধনের ব্যবস্থা করতে এটা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, আইনি গোঁজামিল সংস্কার করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন জরুরি। প্রতিটি জেলায় শিশু আদালত গড়ে, সেই আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। শিশুর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা হবে বিচারককে। বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, যদি সত্যিকার অর্থেই শিশুর অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনার আকাক্সক্ষা থাকে। ধারণা করি, সরকারের চেয়ে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় এ কাজে যোগ্যতর প্রতিষ্ঠান। আইন সহজ, সরল ও মানবিক দৃষ্টিতে গড়ে তুলতে হবে। আর যারা সেই আইনের প্রয়োগ করবেন, তাদেরও থাকতে হবে দক্ষতা ও যোগ্যতা। উচ্চ আদালতের যোগ্য, দক্ষ ও মানবিক দৃষ্টিতে সমৃদ্ধ বিচারকরাই শিশু আইন তৈরিতে ভালো কিছু করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিচারিক মন্ত্রণালয়কেই দায়িত্ব দিয়ে শিশু অপরাধবিষয়ক আইনের সংস্কার সাধন করা যেতে পারে। এটা না হলে শিশুদের অপরাধ চক্র থেকে রক্ষা করা যাবে না। সমাজকেও একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক করে গড়ে তোলা যাবে না, যেখানে শিশুরা নিরাপদ ও অধিকার উপভোগ করতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত