রোমান সাম্রাজ্যের গাম্ভীর্য, মাইকেল এঞ্জেলোর কালজয়ী শিল্পকর্ম, ভেনিসের খালের শান্ত জল কিংবা টাসকান পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়া কমলা সূর্য ইতালি বলতেই বিশ্ববাসীর চোখে ভেসে ওঠে শিল্প, সাহিত্য আর রোমান্সের এক মায়াবী ক্যানভাস। বিখ্যাত ইংরেজ লেখক ডি. এইচ. লরেন্স বলেছিলেন, ‘ইতালিই একমাত্র দেশ, যা একই সঙ্গে আপনাকে শিল্পের প্রেমে ফেলতে বাধ্য করবে।’ কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের লাখো তরুণের কাছে ইতালির এই শৈল্পিক বা ঐতিহাসিক রূপের কোনো আবেদন নেই। তাদের কাছে ইতালি কেবলই এক ‘কান্ট্রি অব হোপ’ বা ভাগ্য বদলের জাদুকাঠি। আর এই জাদুকাঠির স্পর্শ পেতে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি অবৈধপথে পা বাড়াচ্ছেন, এমন এক বিভীষিকাময় যাত্রায় যেখানে পদে পদে অপেক্ষায় রয়েছে মৃত্যু। কিন্তু কেন এই মৃত্যুখেলা? কেন তরুণরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অভিবাসন বিজ্ঞানের ‘পুশ’ এবং ‘পুল’ ফ্যাক্টরের এক নির্মম সমীকরণ আমাদের সামনে আসে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুুু্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশক দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে অবস্থান করছে। এর বাইরে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী, প্রায় এক কোটি ‘নিষ্ক্রিয় তরুণ’ রয়েছেন যারা পড়াশোনা, চাকরি বা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। কর্মসংস্থানের এই অভাব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে যে গভীর হতাশার সৃষ্টি করে, সেটাই তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করে এটি হচ্ছে ‘পুশ ফ্যাক্টর’। অন্যদিকে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইতালির অভিবাসন নীতি, বিশেষ করে ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ বা ‘ফ্লো ডিক্রি’র মতো আইনগত কাঠামো এবং সস্তা শ্রমের চাহিদা কাজ করে ‘পুল ফ্যাক্টর’ হিসেবে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় ‘মাইগ্রেশন আইডিয়ালিজম প্যারাডক্স’ যেখানে তরুণরা ভূমধ্যসাগরের ভয়াবহ বিপদের কথা জেনেও বিশ্বাস করেন, কোনোমতে ইতালির মাটি ছুঁতে পারলেই জীবনের সব গ্লানি মুছে যাবে। আসলে নির্মম বাস্তবতা কি সেই কথা বলে?
স্বপ্নের এই যাত্রার শুরুটাই হয় এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দিয়ে। বৈধ পথে যাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দালালদের হাত ধরে তরুণরা যখন লিবিয়ায় পা রাখেন, তখন থেকেই শুরু হয় তাদের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া, বর্তমানে মানবপাচারকারী এবং মাফিয়াদের একটি নিরাপদ আস্তানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোরগঞ্জের দিপু মিয়ার ঘটনা এই নির্মম বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। ইতালির স্বপ্নে দেশত্যাগ করার পর, তিনি গত দুই বছর লিবিয়ার মাফিয়াদের নির্যাতনকেন্দ্রে আটকে আছেন। তার পরিবারের কাছ থেকে ৪৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়ার পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং, ভিডিও কলে অমানবিক নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। লিবিয়ার এমন বহু অন্ধকার স্থানে, শত শত বাংলাদেশি আটকে আছেন, যারা অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং অনাহারের কষ্ট সহ্য করছেন। যারা এই নির্মম পরিস্থিতি অতিক্রম করতে সক্ষম হন, তাদের নামতে হয় ভূমধ্যসাগরের ভয়ংকর জলরাশিতে। লিবিয়া থেকে ইতালির সিসিলি দ্বীপ বা লাম্পেদুসার কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করতে দালালরা তাদের গাদাগাদি করে রাবারের ছোট নৌকায় তুলে নেয়। উত্তাল সাগরে পথ হারিয়ে, নৌকাটির পাটাতনের নিচে দম বন্ধ হয়ে কিংবা ইঞ্জিন অকেজো হয়ে অসংখ্য তরুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ২০২৩ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো ও নিখোঁজ হওয়া মোট অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১০০ জনেরও বেশি। লিবিয়ার উপকূলে উদ্ধার হওয়া ২৩ জন বাংলাদেশির গলিত মৃতদেহ, এই নির্মম বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও ইনফোমাইগ্রেন্টসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় শত শত বাংলাদেশি নৌকাডুবিসহ নানাভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র তথ্য দিয়েছিল, ৭১৮ জন অভিবাসী কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ কিংবা মারা গেছেন। তাদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৭০১ জনের। ভূমধ্যসাগরে এমন ট্র্যাজেডির যাত্রাটি শুরু হয় মূলত লিবিয়া উপকূল থেকে। বেশিরভাগ অভিবাসী লিবিয়া থেকে কেন্দ্রীয় (সেন্ট্রাল) ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি বা ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের ১২ শতাংশ বাংলাদেশি বলে জানায় আইওএম। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবৈধ মানবপাচার চক্র কেন বছরের পর বছর নির্বিঘেœ তাদের প্রতারণা চালাতে পারছে? এর নেপথ্যে কোন কোন মানুষ জড়িত রয়েছেন। তাদের কবে চিহ্নিত করা হবে, কে জানে? অথবা আদৌ কোনোদিন তারা জনসমক্ষে আসবেন সে নিশ্চয়তাও নেই। সুতরাং, যেভাবে চলছে চলবে সেভাবেই। আমাদের শুধু বলে যাওয়া!
ভূমধ্যসাগরের এই মরণফাঁদ পেরিয়ে যারা ইতালির মাটিতে পা রাখেন, তাদের প্রতীক্ষায় থাকে আরেক কঠিন বাস্তবতা। ইতালির নৌবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর তাদের ঠাঁই হয় ‘সিএএস’ CAS - Centri di Accoglienza Straordinaria) সিস্টেমের অস্বাস্থ্যকর ও কারাগারতুল্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে। রাজনৈতিক আশ্রয়ের যে স্বপ্ন তারা দেখেন, তাও আইনি জটিলতায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়; যার প্রমাণ ২০২২ সালে ৫৬ শতাংশ মানুষের আবেদন বাতিলের পরিসংখ্যান। ‘ডাবলিন রেগুলেশন’-এর মারপ্যাঁচে পড়ে এসব অবৈধ অভিবাসীর স্থান হয় প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে তাদের নামমাত্র মজুরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়, যাকে অনেকেই ‘আধুনিক দাসপ্রথা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি যারা বৈধ পথে যান, তাদেরও একটি বড় অংশ ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে বেকারত্বের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার এই গল্প আসলে, কিছু বিপর্যস্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার গল্প। সোমালি-ব্রিটিশ কবি ওয়ারসান শায়ার লিখেছিলেন, ‘কেউ ঘর ছাড়ে না, যদি না ঘর হাঙরের মুখের মতো ভয়ংকর হয়।’ আমাদের তরুণরা কেন নিজেদের দেশটাকে নিরাপদ মনে করতে পারছেন না, তা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। বিদেশের চকচকে প্রলোভনের আড়ালে যে নীরব মৃত্যুফাঁদ পাতা রয়েছে, তা তরুণদের বোঝাতে হবে। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈধ পথে বিদেশে গমনের সহজলভ্য সুযোগ তৈরি না হলে, ভূমধ্যসাগরের এই কান্না কখনো থামবে না।
লেখক : শিক্ষক ও কলাম লেখক