ক্লান্তিহীন ওসির দিনরাত

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৯ এএম

থানায় ওসির (পরিদর্শক) কোনো বিশ্রাম নেই। তার জীবনে বিশ্রাম মেলে, যদি তিনি অসুস্থ বা ছুটি নেন, তাহলেই কেবল তখনই বিশ্রামের সুযোগ পান। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয় তাকে। ওসিরা সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও, দীর্ঘ সময় ডিউটি করতে বাধ্য হন। কখনো কখনো রাতেও তিনি ছুটে আসেন থানায়। পরিদর্শক ও এএসপি পদ দুটি একই মর্যাদার হলেও, ওসির কপালে পদোন্নতি যদি জোটে তবে সে জন্য চলে যায় ১৫/১৬ বছর। আর এএসপিকে ব্যয় করতে হয় ৩-৪ বছর। পুলিশে এই বৈষম্য সুদীর্ঘকালের। ক্যাডার ও নন-ক্যাডার থেকেই এই বৈষম্য। এ ছাড়া বহু রকম বৈষম্য আছে পুলিশে। সে বিষয়গুলো দেশ রূপান্তরের রিপোর্টে উঠে এসেছে। এ-থেকে বোঝা যায়, পুলিশ বাহিনীতে কত জটিলতা রয়ে গেছে।

পুলিশের সংখ্যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। এটা মহানগরের বাইরে গেলেই সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে। ঢাকার জনবসতির সংখ্যা ২ থেকে আড়াই কোটি। এই পরিমাণ মানুষের জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, বর্তমানদের দিয়ে অসম্ভব। তার ওপর পুলিশের নেই যানবাহন ও প্রয়োজনীয় অস্ত্র, যা অপরাধীদের অপতৎপরতা থামাতে সহায়ক। পুলিশ কনস্টেবল প্রয়োজনের চেয়ে বহু কম। তাদের মধ্যে অস্ত্রধারী ও নিরস্ত্র পুলিশ আছে। অপরাধ দমনে এরা তেমন ভালো উদ্যোগ নিতে পারে না। ট্রাফিক পুলিশের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, যানজটমুক্ত রাস্তাঘাট কায়েম করা খুব কঠিন। ঢাকার রাজপথের ট্রাফিকিং যে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় রয়েছে, তা সমাধানে সরকারের কোনো দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। ট্রাফিক জ্যামের মূল কারণ,  চালকদের আইন মেনে না চলা। কেউ বলতে পারবেন না, সড়কের গাড়িগুলো ট্রাফিক আইন মেনে চলাচল করে। সেই গাড়ি হোক ব্যক্তিগত বা ওই শ্রেণির গাড়ি, হোক বাস, ট্রাক বা লরি। দ্বিতীয় সমস্যা অযান্ত্রিক যানবাহন। এক রিপোর্ট বলছে,  দুর্ঘটনার মধ্যে বাইকের সংখ্যাই বেশি। তারা আইনকে থোড়াই কেয়ার করে। বর্তমানে যান্ত্রিক রিকশা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, অদক্ষ চালকের কারণে। যেহেতু এদের কোনো লাইসেন্স নেই, ট্রাফিক পুলিশ তাদের ঠেকাতেও পারছে না। সড়কে যারা ডিউটি করছেন, তারাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের কি ঝুঁকিভাতা দেওয়া হয়?

একজন অধ্যাপক বলেছেন, পুলিশে বিশ্রামবিহীন ডিউটি নিয়মবহির্ভূত কাজ। তার কথাকে যদি আমলে নেওয়া হয়, তাহলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাব দিতে হবে, আইনে প্রকৃত সত্য কী। জবাবদিহি বিষয়টি আমাদের সমাজ, রাজনৈতিক প্রশাসন, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীতে কতটা আছে, তা নিরিখ করে দেখতে হবে। একজন ওসিকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া উচিত। তার ডিউটি ৮ ঘণ্টার চেয়ে বেশি হবে না। বিশ্রামের পাশাপাশি তার ঝুঁকিভাতা, সোর্সমানি এবং লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ সদস্যের সংখ্যা কত হওয়া প্রয়োজন, বাহিনী নির্মাতারা তা ভালো বলতে পারবেন। আমরা ধারণা করি, কম করে হলেও ৫ লাখ পুলিশ প্রয়োজন। নগর ও মহানগরে যত পুলিশ থাকা জরুরি, তার বাইরে ৫ লাখ পুলিশ নিয়োগ পেলে জননিরাপত্তা সুদৃঢ় করা যাবে। গ্রামাঞ্চলে পুলিশের যাতায়াতে বাহন জরুরি। তা না হলে তারা পুলিশি সেবা দিতে পারবে না। তাদের বেতন কাঠামো  উন্নত করার বিকল্প নেই। পুলিশে কম বেতন দেওয়া মানে হচ্ছে, ঘুষ-দুর্নীতিকে আবাহন করা। পুলিশ কেবল ঘুষ খায়, সেবা নামকা-ওয়াস্তে দিতে পারে। পদায়নের ক্ষেত্র থেকেই পুলিশ বিভাগে ঘুষ লাগে। ভালো পোস্টিংয়ের জন্য ঘুষ ঊর্ধ্বতনরা নেন। অধিকাংশই যে মানসিকভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত, এটা অস্বীকার করা যাবে না। পুলিশি কাঠামো সংস্কার ও বেতন কাঠামো সংস্কার এবং মানসিক বৈষম্য দূর করার পর আমরা বলতে পারব, তারা জনগণকে সেবা দিতে পারছেন। এর আগে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা কী করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত